তারাপীঠ: পুণ্যভূমি তারাপীঠে মা তারার দর্শন করতে গেলে এবার থেকে পোশাক-আশাকের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে ভক্তদের। শক্তিপীঠ তারাপীঠের মর্যাদা, পবিত্রতা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পোশাকবিধি (ড্রেস কোড) কার্যকরে আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করছে তারাপীঠ মন্দির কমিটি। কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, হাফপ্যান্ট, বারমুডা, লুঙ্গি কিংবা গামছা পরে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করা বা মায়ের বিগ্রহ স্পর্শ করা আর চলবে না। কেবল সাধারণ দর্শনার্থীরাই নন, মন্দিরের সহযোগী সেবায়েতদের জন্যও অত্যন্ত নির্দিষ্ট পোশাকবিধি চালু হতে চলেছে। মন্দির কর্তৃপক্ষের এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে বীরভূমের এই বিখ্যাত তীর্থক্ষেত্রে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
মন্দির কমিটি সূত্রে জানা গিয়েছে, তারাপীঠ মন্দিরে পোশাক সংক্রান্ত বিধিনিষেধের বিষয়টি একেবারে নতুন না হলেও, বাস্তবে এতদিন তার যথাযথ বা কঠোর প্রয়োগ হচ্ছিল না। অনেক দর্শনার্থীই পর্যটন কেন্দ্রের মেজাজে অনায়াসে হাঁটু ওড়ানো পোশাক কিংবা অতি-আকস্মিক শালীনতাহীন জামাকাপড় পরে গর্ভগৃহ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছিলেন। এতে মন্দিরের সনাতন পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে বলে বহু দিন ধরেই পুণ্যার্থীদের একাংশ ও প্রবীণ পুরোহিতরা ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন। তাই এবার সেই নিয়মকে শতপ্রতিশত কার্যকর করতে কড়া মনোভাব গ্রহণ করেছে মন্দির ট্রাস্ট কমিটি।
নতুন নিয়ম কার্যকর করতে এবং ভক্তদের আগাম সতর্ক করতে মন্দির চত্বর ও সংলগ্ন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বিশালাকার সচেতনতামূলক বোর্ড বা ফ্লেক্স লাগানো হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্ত ও পর্যটক তারাপীঠে মা তারার চরণ স্পর্শ করতে আসেন। তাঁরা যাতে দূর থেকেই কিংবা মন্দিরে প্রবেশের আগেই এই বিধিনিষেধ সম্পর্কে অবগত হতে পারেন, সেই সুবন্দোবস্ত করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের সাফ বক্তব্য, ‘‘তারাপীঠ কোনও সাধারণ ভ্রমণ বা বিনোদন কেন্দ্র নয়। এটা কোটি কোটি মানুষের আস্থার পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। ফলে মায়ের চরণে প্রবেশের ক্ষেত্রে শালীন ও শোভনীয় পোশাক পরা একান্ত প্রয়োজন।’’
তবে শুধু ভক্তদের জন্য নয়, মন্দিরের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিষেবায় স্বচ্ছতা আনতেও আনা হচ্ছে একগুচ্ছ বড় পরিবর্তন। কালীপুজোর পর থেকেই মন্দিরের সহযোগী সেবায়েতদের জন্য নির্দিষ্ট রঙের পোশাক বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। মূল পুরোহিতরা আগের মতোই ঐতিহ্যবাহী লাল পোশাক পরিধান করবেন। তবে সহযোগী সেবায়েতদের জন্য একটি নির্দিষ্ট পোশাক নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে, যাতে পুণ্যার্থীরা সহজেই দায়িত্বপ্রাপ্ত পুরোহিত ও সহযোগী সেবায়েতদের চিনতে পারেন এবং কোনও বিভ্রান্তি বা প্রতারণার শিকার না হন।
এই প্রসঙ্গে তারাপীঠ মন্দির কমিটির সম্পাদক পুলক চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘‘সহযোগী সেবায়েতদের পরিচয়পত্র যাচাই এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহের কাজ ইতিমধ্যেই জোরকদমে চলছে। কালীপুজোর পর্ব মিটে গেলেই পুরোদমে নতুন পোশাকবিধি কার্যকরের পরিকল্পনা রয়েছে। মন্দিরের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ভক্তদের জন্য পরিষেবায় স্বচ্ছতা আনতেই আমাদের এই যৌথ উদ্যোগ।’’
দক্ষিণ ভারতের বহু বিখ্যাত মন্দিরে এবং সম্প্রতি পুরীর জগন্নাথ মন্দিরেও কঠোর পোশাকবিধি চালু হয়েছে। এবার বাংলা তথা দেশের অন্যতম প্রধান এই শক্তিপীঠেও সেই পথেই হাঁটল প্রশাসন ও মন্দির কমিটি। তারাপীঠের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন সাধুসন্ত ও স্থানীয় প্রবীণ পুরোহিতদের বড় অংশ। তাঁদের মতে, পবিত্র তীর্থস্থানের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে এই ধরণের পদক্ষেপ বহু আগেই প্রয়োজন ছিল। আগামী দিনে কালীপুজোর পর থেকে মা তারার মন্দিরে ঢোকার আগে পোশাকে শালীনতা বজায় রাখছেন কি না, সে বিষয়ে গেটেই রাখা হবে বিশেষ নজরদারি।
Leave a comment