ওয়াশিংটন: হোয়াইট হাউসের একেবারেই অদূরে টহলদারির সময় ধরা পড়ল এক সশস্ত্র দুষ্কৃতী। ঘটনাকে ঘিরে চরম আতঙ্ক ছড়াল আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে। রুটিন টহলদারির সময় ইউএস সিক্রেট সার্ভিস এক সন্দেহভাজন যুবককে আটক করে।
তল্লাশি চালাতেই উদ্ধার হল এআর-১৫ (AR-15) স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, ম্যাক-১০ (MAC-10) মেশিন পিস্তল, একটি গ্লক ৪৩-এক্স (Glock 43x) পিস্তল এবং বিপুল পরিমাণ তাজা কার্তুজ। আটক ব্যক্তির নাম রনি ইওরড্রিক্স গুয়ানিপা চিরিনোস (২৬)।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই ভেনেজুয়েলীয় যুবক জানিয়েছে, তার মাথার ভেতরের ‘অদৃশ্য কোনো আওয়াজ’ তাকে ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিল! বৃহস্পতিবার গভীর রাতের এই ঘটনায় ট্রাম্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ফের চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সিক্রেট সার্ভিস এবং অপরাধমূলক অভিযোগপত্র (ক্রিমিনাল কমপ্লেন) সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের ঠিক কিছুটা আগে হোয়াইট হাউস চত্বরের অত্যন্ত কাছে কনস্টিটিউশন অ্যাভিনিউতে একটি নীল রঙের ফোর্ড এফ-১৫০ পিকআপ ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন দায়িত্বরত এক কর্মকর্তা।
গাড়িটির গতিবিধি ও অবস্থান সন্দেহজনক মনে হওয়ায় সিক্রেট সার্ভিসের ওই কর্মকর্তা এগিয়ে যান। তিনি চালকের আসনে বসে থাকা যুবকের কাছে জানতে চান, তিনি সুরক্ষিত আছেন কি না এবং তাঁর কাছে কোনও আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে কি না।
আদালতে পেশ করা নথিতে বলা হয়েছে, কর্মকর্তা প্রশ্ন করতেই অভিযুক্ত যুবক চিরিনোস মুখে কিছু না বলে মাথা নাড়ান এবং আঙুল দিয়ে বন্দুকের মতো ভঙ্গিমা করেন। এরপর তিনি গাড়ি থেকে নেমে আসেন। ইংরেজি না জানার কারণে গুগ্ল ট্রান্সলেটের (Google Translate) সাহায্য নিয়ে তদন্তকারীদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
তাঁর দাবি, কেউ একজন তাঁকে এই পিস্তল দিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল এবং তিনি সেই আততায়ীর হাত থেকেই নাকি অস্ত্রটি কেড়ে নিয়েছিলেন। এর পর নিজের গাড়ির ভেতরে রাখা একটি বাদামি রঙের ব্যাগের দিকে নির্দেশ করেন তিনি।
ওই গাড়িতে তল্লাশি চালাতে গিয়ে চোখ কপালে ওঠে কর্মকর্তাদের। ব্যাগের ভেতর থেকে একটি এআর-১৫ রাইফেল, একটি মেশিন পিস্তল ও পিস্তল ছাড়া প্রচুর কার্তুজ উদ্ধার হয়। পুলিশের আরও তদন্তে উঠে আসে যে, ওই ফোর্ড পিকআপ ট্রাকটি দক্ষিণ ক্যারোলাইনা (South Carolina) থেকে চুরি করা হয়েছিল। চুরির গাড়িতে করে বিপুল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একেবারে হোয়াইট হাউসের মুখে পৌঁছনোর ঘটনায় স্তম্ভিত সিক্রেট সার্ভিস।
আরও পড়ুন: মধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে ভিটো প্রয়োগের হুঙ্কার ট্রাম্পের!
মার্কিন স্বরাষ্ট্র সুরক্ষা দফতর (DHS)-এর তরফে জানানো হয়েছে, চিরিনোস কর্মকর্তাদের কাছে স্বীকার করেছে যে তার মাথার ভেতর প্রতিনিয়ত ভেসে আসা কিছু ‘অদৃশ্য কণ্ঠস্বর’ তাকে ট্রাম্পকে খুন করার জন্য ওয়াশিংটনে আসার নির্দেশ দিয়েছিল। যদিও ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া (DC) সুপিরিয়র কোর্টে পেশ করা হলফনামায় এই ‘অদৃশ্য আওয়াজ’ সম্পর্কিত বক্তব্যের সরাসরি উল্লেখ রাখা হয়নি।
এই চরম স্পর্শকাতর ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ইউএস সিক্রেট সার্ভিসের নির্দেশক শন কারান। তিনি বলেন, ‘‘এই নজিরবিহীন ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, এই মুহূর্তে আমরা কতটা উত্তপ্ত ও বিপজ্জনক হুমকি-পরিবেশের মধ্যে কাজ করছি। একের পর এক সশস্ত্র ব্যক্তি যেভাবে বারবার হোয়াইট হাউস চত্বরের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে, তা যথেষ্ট উদ্বেগের।’’
তিনি আরও জানান, এই ধরনের অপ্রত্যাশিত ঘটনার মোকাবিলা করার জন্য সিক্রেট সার্ভিসের কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া থাকে, তবে সাম্প্রতিককালে নিরাপত্তা সংক্রান্ত হুমকির সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
মার্কিন মার্শাল সার্ভিস অভিযুক্ত চিরিনোসকে হেফাজতে নিয়েছে। তার বিরুদ্ধে লাইসেন্স ছাড়া পিস্তল ও রাইফেল বহন, বেআইনিভাবে আগ্নেয়াস্ত্র রাখা, চুরি করা সম্পত্তি নিজের হেফাজতে রাখা এবং অবৈধভাবে চুরির গাড়ি ব্যবহারের মতো একগুচ্ছ জামিনঅযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। শুক্রবার অভিযুক্তকে ডিসি সুপিরিয়র কোর্টে তোলা হলে বিচারক তার জামিন নামঞ্জুর করেন। ফলে আপাতত শ্রীঘরেই থাকতে হচ্ছে তাকে।
স্বরাষ্ট্র সুরক্ষা দপ্তর (DHS) সূত্রে জানা গিয়েছে, ২৬ বছর বয়সি এই ভেনেজুয়েলীয় যুবক প্রকৃতপক্ষে এক জন অনুপ্রবেশকারী। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে টেক্সাস সীমান্ত দিয়ে বেআইনিভাবে আমেরিকায় প্রবেশ করেছিল সে। ইতিমধ্যে আমেরিকান ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) চিরিনোসের বিরুদ্ধে অভিবাসন সংক্রান্ত বিশেষ গ্রেফতারি পরোয়ানা বা ডিটেইনার জারি করেছে।
আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে এক জন অনুপ্রবেশকারী কীভাবে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে লক্ষ্য করে দেশের সুরক্ষিততম এলাকার দোরগোড়ায় অস্ত্রসহ পৌঁছে গেল, তা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর।
Leave a comment