শ্রীভূমির ক্লাবের গোপন গুদামে কোটি কোটি টাকার সরকারি লুঠ! গঙ্গাসাগর মেলার রাশি রাশি উপহার আর ত্রাণ উদ্ধার হতেই হুলস্থুল লেকটাউনে
লেকটাউন: চোখ ধাঁধানো বুর্জ খলিফা কিংবা ভ্যাটিকান সিটির মণ্ডপ তৈরি করে যে শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব এতদিন কেবল দুর্গাপুজোর জৌলুসের জন্য খবরের শিরোনামে থাকত, এবার সেই ক্লাবই জড়িয়ে পড়ল এক অতি চাঞ্চল্যকর ও নজিরবিহীন দুর্নীতির আবর্তে। ক্লাবের খেলার মাঠের ভেতরের একটি বন্ধ ঘর থেকে আচমকাই উদ্ধার হলো বিপুল পরিমাণ সরকারি ত্রাণ সামগ্রী এবং গঙ্গাসাগর মেলার জন্য বরাদ্দ হওয়া ভিভিআইপি উপহারের এক বিশাল স্তূপ। বস্তা বস্তা কম্বল, লুঙ্গি, ছোট বাচ্চাদের পোশাক থেকে শুরু করে থরে থরে সাজানো রান্নার উনুন, হাঁড়ি, কড়াই, গামলা—কী নেই সেখানে! এমনকি, কলকাতা পুরসভার সরকারি সিলমোহর ও ছাপ মারা বালতিও উদ্ধার হয়েছে ওই গোপন ঘর থেকে, যা দেখে চক্ষুচড়কগাছ তদন্তকারীদের।[TECHTARANGA-POST:9905]এই ঘটনা সামনে আসতেই লেকটাউন তথা সল্টলেক এলাকা জুড়ে তীব্র রাজনৈতিক ভূকম্পন শুরু হয়ে গিয়েছে। দুর্নীতির তির সরাসরি ঘুরে গিয়েছে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা স্থানীয় তৃণমূল হেভিওয়েট বিধায়ক সুজিত বসুর দিকে। কারণ, যে শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবকে কেন্দ্র করে এই তোলপাড়, তার দণ্ডমুণ্ডর কর্তা ছিলেন স্বয়ং সুজিতবাবুই। যে ঘরটি থেকে কোটি কোটি টাকার এই সরকারি সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে, সেটি বিধাননগর পুরসভার ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত, যার কাউন্সিলর তথা পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান হলেন নিতাই দত্ত। অভিযোগ, সাধারণ মানুষের করের টাকায় কেনা এই সমস্ত মূল্যবান জিনিস দেখভালের চরম অভাবে এবং রাজনৈতিক উদাসীনতায় ঘরে পড়ে পড়েই নষ্ট হতে বসেছে। খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে অনুগামীদের নিয়ে ধেয়ে আসেন এই কেন্দ্রের বিজেপি নেতা দেবদীপ সিংহ রায়। তিনি তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “তৃণমূল জমানায় যখন কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আমজনতা একটা ত্রিপল বা কম্বলের জন্য হাহাকার করেছে, তখন সরকারি গুদামে না রেখে এই ক্লাবের ঘরে গরিবের হকের ত্রাণসামগ্রী লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।”[TECHTARANGA-POST:9905]তল্লাশি যত এগিয়েছে, ওই ঘরের ভেতর থেকে ততই হাড়হিম করা সব চুরির তথ্য সামনে এসেছে। উদ্ধার হওয়া জিনিসপত্রের স্তূপ ঘেঁটে পাওয়া গিয়েছে ২০২২ সালের সরকারি ‘শিক্ষক দিবস’-এর লোগো ও ছাপ মারা বহু সামগ্রী। তবে সবথেকে বড় কেলেঙ্কারি ধরা পড়েছে গঙ্গাসাগর মেলার সামগ্রী মেলায়। ২০২৪ এবং খোদ ২০২৬ সালের গঙ্গাসাগর মেলায় আগত পুণ্যার্থী ও বিশেষ অতিথিদের দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারের তরফ থেকে যে বিশেষ উপহারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তার একটা সিংহভাগই মজুত ছিল এই ক্লাবের অন্ধকার ঘরে। পুজো সামগ্রী রাখার পিতলের দামি পাত্র থেকে শুরু করে গঙ্গাজল নেওয়ার সুদৃশ্য পিতলের ঘটি উদ্ধার হয়েছে রাশি রাশি, যা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিজস্ব ব্র্যান্ড ‘বিশ্ব বাংলা’-র লোগো দেওয়া বিশেষ প্যাকেটে মুড়ে রাখা ছিল।[TECHTARANGA-POST:9904]এই চাঞ্চল্যকর চুরির ঘটনার নেপথ্যে যে এক বিশাল চক্র কাজ করছে, তা নিয়ে একপ্রকার নিশ্চিত বিরোধীরা। প্রসঙ্গত, ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত গঙ্গাসাগর মেলার মূল ব্যবস্থাপনার প্রধান দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন মন্ত্রী সুজিত বসু। আর সেই কারণেই সুজিত বসুর নিজের খাসতালুক এবং নিজের ক্লাবের মাঠ থেকে মেলার কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার হওয়াটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না বলে দাবি করছে বিজেপি। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই স্থানীয় কাউন্সিলর নিতাই দত্ত ও সুজিত বসুর বিরুদ্ধে লেকটাউন থানায় একটি লিখিত এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ ওই ঘরটি সিল করে দিয়ে সমস্ত সরকারি সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করেছে। সরকারি সম্পত্তি তছরুপ এবং চুরির এই মহা-কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অপরাধে খুব শীঘ্রই সুজিত বসু ও তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা পুরসভার মেম্বারদের নোটিস পাঠিয়ে তলব করা হতে পারে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।