ফুটবল মাঠ থেকে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গণ-এবার বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর হাফিজ
ঢাকা: একটা মানুষ কি তার একজীবনে অনেক কিছু হতে পারে? কয়টা পরিচয়ে পরিচিত হতে পারে সে—দু’টি, তিনটি, চারটি? কিংবা তারও বেশি? কিন্তু যখন শুনবেন বাংলাদেশের এক কৃতী সন্তান, কীর্তিমান পুরুষ ১১টি পরিচয়ে পরিচিত, তখন বিস্মিত না হয়ে উপায় থাকে না।[TECHTARANGA-POST:7246]যার কথা বলা হচ্ছে, তিনি একই অঙ্গে বহু গুণের অধিকারী—ফুটবলার, অ্যাথলেট, দ্রুততম মানব, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বাফুফের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, এএফসির সহসভাপতি, ফিফার আপিল ও ডিসিপ্লিনারি কমিটির সদস্য, রাজনীতিবিদ ও মন্ত্রী।বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) এই দীর্ঘ পরিচয়ের তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরেকটি নতুন পরিচয়। তিনি এখন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ সংসদের স্পিকার।তিনি হলেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্য।এই প্রজন্মের কাছে মেজর হাফিজ মূলত একজন রাজনীতিবিদ হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু অনেকেই জানেন না, তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের কিংবদন্তিতুল্য এক ফুটবলার। বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক ক্রীড়াবিদ রাজনীতিতে এসেছেন। হাফিজও তাঁদেরই একজন। কিন্তু অন্যরা যা হতে পারেননি, তা হয়ে দেখিয়েছেন তিনি—আজ তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার। সাবেক কোনো ক্রীড়াবিদ এর আগে এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে বসেননি।ফলে তাঁর স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার খবরে ফুটবলসহ দেশের পুরো ক্রীড়াঙ্গনেই দেখা দিয়েছে উচ্ছ্বাস।[TECHTARANGA-POST:7260]ফুটবল মাঠে গোলের জাদুস্বাধীনতার পর ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের জার্সিতে গোলের জাদু দেখিয়েছেন মেজর হাফিজ। মোহামেডানের হয়ে তিনি লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতার কৃতিত্ব অর্জন করেন।তবে শুধু ফুটবলেই নয়, অ্যাথলেটিক্সেও তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল। একাধিকবার তিনি পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানব নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়াক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সম্মান ‘ব্লু’ পদকও অর্জন করেন।২০০৪ সালে ফুটবলে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফা তাঁকে ‘অর্ডার অব মেরিট’ সম্মানে ভূষিত করে—যা বাংলাদেশের কোনো ফুটবল ব্যক্তিত্বের জন্য অন্যতম বড় স্বীকৃতি।সাবেক ফুটবলারদের সংগঠন সোনালী অতীত ক্লাবের অন্যতম উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।[TECHTARANGA-POST:7248]মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে১৯৭১ সালে তাঁর ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’-এর হয়ে খেলার কথা ছিল। কিন্তু ফুটবল মাঠে নয়—তিনি বেছে নেন রণাঙ্গন। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন অস্ত্র হাতে।যুদ্ধক্ষেত্রে অসীম সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পান ‘বীর বিক্রম’ খেতাব।ফুটবল মাঠে তিনি ছিলেন নিখাদ স্ট্রাইকার—প্রতিপক্ষের কাছে রীতিমতো আতঙ্ক। বলের ওপর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ, ড্রিবলিং করে গোল করা কিংবা সতীর্থকে দিয়ে গোল করানোর দক্ষতায় তিনি ছিলেন অনন্য।ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরুমেজর হাফিজের জন্ম বরিশালে, ১৯৪৪ সালের ২৯ অক্টোবর। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি ছিল প্রবল আকর্ষণ। যদিও পরিবার প্রথমদিকে এতে সায় দেয়নি। তবু পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা চালিয়ে যান।বরিশালের জনপ্রিয় ফুটবলার দেলোয়ার ছিলেন তাঁর কাজিন। তাঁকে দেখেই ফুটবলের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ে। এছাড়া বিখ্যাত ফুটবলার গজনবী ও কবিরও তাঁর অনুপ্রেরণা ছিলেন।৫ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতার এই ফুটবলারের ক্যারিয়ার শুরু হয় ১৯৬২ সালে ঢাকায় ফায়ার সার্ভিস দলের হয়ে। সেখানে খেলেন ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত।[TECHTARANGA-POST:7244]এরপর পর্যায়ক্রমে খেলেনওয়ান্ডারার্স (১৯৬৬–১৯৬৮)মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব (১৯৬৮–১৯৭৮)মোহামেডানের হয়ে ১৯৬৯, ১৯৭৫, ১৯৭৬ ও ১৯৭৮ সালে লিগ চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৭৬ সালে তিনি দলের অধিনায়ক ছিলেন।স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে প্রথম ডাবল হ্যাটট্রিক করার কৃতিত্বও তাঁর।১৯৭৬ সালে তিনি লিগের টপ স্কোরার হন।১৯৬৮ সালে মোহামেডানের হয়ে জেতেন ঐতিহ্যবাহী আগাখান গোল্ড কাপ।[TECHTARANGA-POST:7263]পাকিস্তান জাতীয় দলে বাঙালি প্রতিনিধিপাকিস্তান আমলে ক্রীড়াঙ্গনেও বাঙালিদের প্রতি ছিল বৈষম্য। তবুও নিজের অসাধারণ নৈপুণ্যের কারণে তিনি পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে জায়গা করে নেন।১৯৬৬ সালে সফররত সৌদি আরব দলের বিপক্ষে ম্যাচে তিনি জাতীয় দলে নির্বাচিত হন।এরপর তিনি খেলেন১৯৬৭ সালে বার্মায় এশিয়া কাপ১৯৬৮ সালে ঢাকায় এলসিডি দলের বিপক্ষেসফররত সোভিয়েত ইউনিয়নের অলগা দলের বিপক্ষে১৯৬৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরতেহরানে ফ্রেন্ডশিপ কাপতুরস্কের আংকারায় আরসিডি টুর্নামেন্ট১৯৭০ সালে তেহরানে আরসিডি টুর্নামেন্টএকবার জাতীয় দলের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।১৯৭২ সালের ৪ ও ১১ নভেম্বর ঢাকা স্টেডিয়ামে কলকাতার ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশ নির্বাচিত একাদশের অধিনায়ক ছিলেন তিনি।তবে পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে আর খেলার সুযোগ না পাওয়া তাঁর জীবনের অন্যতম বড় আক্ষেপ হয়ে রয়েছে।[TECHTARANGA-POST:7234]রাজনীতি থেকে স্পিকারের আসনেনব্বইয়ের দশক থেকে তিনি রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন এবং মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।তবে ২০২৬ সালের এই নতুন অধ্যায়টি তাঁর জীবনে সম্পূর্ণ আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। কারণ অতীতে অনেক ক্রীড়াবিদ সংসদ সদস্য কিংবা ক্রীড়ামন্ত্রী হয়েছেন, কিন্তু জাতীয় সংসদের স্পিকার হওয়ার নজির আগে ছিল না।ফুটবল মাঠের সেই ‘দ্রুততম মানব’ আজ জাতীয় সংসদের অভিভাবক।ফুটবল মাঠ, মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গণ আর রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদের এই যাত্রা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য কীর্তি।