মুম্বই: সুদূর আমেরিকা থেকে কুখ্যাত লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট ও দূরনিয়ন্ত্রিত অপরাধ নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা অন্যতম শীর্ষ গ্যাংস্টার হ্যারি বক্সারকে শনিবার গ্রেফতার করল মার্কিন পুলিশ।
ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলির যৌথ তদারকিতে এই বড়সড় সাফল্য এসেছে বলে খবর। ধৃত হ্যারি বক্সারের বিরুদ্ধে একাধিক খুন, প্রাণনাশের হুমকি এবং কোটি কোটি টাকা তোলাবাজির ভূরি ভূরি মামলা রুজু রয়েছে ভারতে।
সম্প্রতি জনপ্রিয় বলিউড প্রযোজক ও পরিচালক রোহিত শেট্টির মুম্বইয়ের বাসভবনের সামনে প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের ঘটনায় সরাসরি নাম জড়িয়েছিল এই হ্যারির। ভারত সরকারের আবেদনের প্রেক্ষিতে আমেরিকা থেকে তাকে গ্রেফতার করার পর থেকেই বলিপাড়া ও মুম্বইয়ের শিল্পমহলে সাময়িক স্বস্তির আবহ তৈরি হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের খবর, গত কয়েক বছর ধরে আমেরিকা ও কানাডায় আত্মগোপন করে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের অপরাধ সাম্রাজ্যের একটি বৃহৎ অংশ সামলাচ্ছিল হ্যারি বক্সার। বিশেষ করে বলিউড তারকা ও শিল্পপতিদের কাছ থেকে নিয়মিত কোটি কোটি টাকার হপ্তা তোলা, ফোনে ও সোশাল মিডিয়ায় হুমকি বার্তা পাঠানো এবং ভারতজুড়ে নিজের শার্পশুটারদের দিয়ে হামলা চালানোর নীলক নকশা তৈরি করাই ছিল হ্যারির প্রধান কাজ।
আরও পড়ুন : বিগ বির ‘জলসা’র পর এবার বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে বোমাতঙ্ক! উড়িয়ে দেওয়ার হুমকিতে মুম্বইজুড়ে হাই অ্যালার্ট
সাম্প্রতিককালে প্রযোজক-পরিচালক রোহিত শেট্টির মুম্বইয়ের বাড়ির বাইরে যে প্রকাশ্যে এলোপাতাড়ি গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছিল, সেই হামলার দায় সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট ও অডিও বার্তা ছেড়ে প্রকাশ্যে স্বীকার করে নিয়েছিল এই হ্যারি বক্সার।
হামলার ঘটনার পরপরই সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর অডিও বার্তায় তোলপাড় পড়ে যায় বলিপাড়ায়। সেখানে এক বক্তা নিজেকে ‘আরজু বিষ্ণোই’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে দাবি করে যে, হ্যারি বক্সার এবং শুভব লোনকরের প্রত্যক্ষ নির্দেশেই রোহিত শেট্টির বাড়িতে সেই হামলা চালানো হয়েছিল।
একটি বার্তায় রীতিমতো হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছিল, ‘‘রোহিত শেট্টির বাড়ির হামলাটি ছিল নেহাতই একটি ছোট ট্রেলার। গ্যাংয়ের শত্রু বা প্রতিপক্ষ দলকে যাঁরা পেছন থেকে মদত দিচ্ছেন, তাঁদের জন্য সামনে মারাত্মক পরিণতি অপেক্ষা করছে।’’ শুধু রোহিতই নন, বিষ্ণোই সিন্ডিকেটের হিটলিস্টে থাকা বলিউডের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বকে বিভিন্ন অডিও বার্তা ও ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে প্রাণনাশের হুমকিও দিয়ে আসছিল হ্যারি।
উল্লেখ্য, বর্তমানে গুজরাতের সবরমতী কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে বন্দি রয়েছে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের মূল প্রধান লরেন্স বিষ্ণোই। ১৯৯৮ সালের কৃষ্ণসার হরিণ শিকার মামলায় বলিউড মেগাস্টার সলমন খানের প্রতি নিজের চরম শত্রুতা ও প্রতিহিংসার কথা একাধিকবার প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছে লরেন্স।
সলমনের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত বা তাঁর পাশে দাঁড়ানো বলিপাড়ার যেকোনো ব্যক্তিত্বকেই নিশানা বানানো ছিল বিষ্ণোই চক্রের নতুন কৌশল। সেই পরিকাঠামোতেই মুম্বইয়ে আতঙ্ক তৈরি করতে রোহিত শেট্টির বাসভবনে গুলি চালানো হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হয় মুম্বই পুলিশ ও ক্রাইম ব্রাঞ্চ।
হ্যারি বক্সারের এই গ্রেফতারি হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মার্কিন মুলুকে আশ্রয় নেওয়া ভারতীয় অপরাধীদের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ভারতের যৌথ অভিযানের এটি একটি বড় সাফল্য।
মাত্র কয়েক দিন আগেই আমেরিকাতেই দীর্ঘ নজরদারির পর ধরা পড়েছে আরও দুই দুর্ধর্ষ ভারতীয় গ্যাংস্টার হিমাংশু ভাউ এবং নীরজ ফরিদিপুরিয়া। তার পরই মার্কিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে হ্যারির গ্রেফতারি বিষ্ণোই নেটওয়ার্কের কোমর অনেকটাই ভেঙে দিল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশ্লেষকরা।
মুম্বই পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা শনিবার জানিয়েছেন, ‘‘আম আমেরিকায় হ্যারি বক্সারের ধরা পড়া অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক খবর। আমাদের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য হবে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে তাকে ভারতে প্রত্যর্পণ করা। রোহিত শেট্টির বাড়ির বাইরে গুলির ঘটনার তদন্তে তাকে সামনাসামনি জেরা করা অত্যন্ত জরুরি। ভারতীয় আইনের মুখোমুখি হতে হবে প্রতিটি অপরাধীকে।’’
এই গ্রেফতারির পর মুম্বইয়ে বলিউড তারকাদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বলয় আরও জোরদার ও নিশ্ছিদ্র করা হয়েছে।
Leave a comment