•
Home কলকাতা গণনার অতীত অনন্য রূপ, দেড় শতক পেরিয়েও শিবপুরের হাজার হাত কালীতলায় রহস্য
কলকাতাপশ্চিমবঙ্গ

গণনার অতীত অনন্য রূপ, দেড় শতক পেরিয়েও শিবপুরের হাজার হাত কালীতলায় রহস্য

Share
শিবপুরের হাজার হাত কালী। নিজস্ব ছবি
Share

শিবপুর: ভাগীরথীর পূর্ব পারের কোলাহল যখন নিত্যদিনের ব্যস্ততায় মুখর, তখন গঙ্গার পশ্চিম কূলে হাওড়ার শিবপুর ওলাবিবিতলার শান্ত গলিটির বাতাসে এক অদ্ভুত রহস্য ঘনীভূত হয়ে থাকে। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ পাড়ার মোড় বলে মনে হলেও, এলাকার এক দেড় শতক প্রাচীন মন্দিরে পা রাখলেই বদলে যায় আবহাওয়া। 

নাম হাজার হাত কালীতলা। বাংলার অগণিত শক্তিপীঠ ও কালীক্ষেত্রের ভিড়ে এই মন্দির এক সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ইতিহাস বহনে সচেষ্ট। কারণ, এখানকার অধিষ্ঠাত্রী দেবী চারভুজা বা দ্বিভুজা নন; তিনি সহস্রভুজা। আর সেই সহস্র হস্তের গণনাই আজ দেড় শ বছর ধরে অধরা রয়ে গিয়েছে বিশ্বাসী ও কৌতুহলী মননের কাছে।

ইতিহাস ও লোকশ্রুতির সীমানা যেখানে মিলেমিশে একাকার, ঠিক সেখান থেকেই সূচনা এই দেবালয়ের। সালটা আনুমানিক ১৮৭০ থেকে ১৮৮০-র মধ্যবর্তী কোনও এক সময়। কলকাতার চোরবাগানের বাসিন্দা, প্রখ্যাত তান্ত্রিক আশুতোষ মুখোপাধ্যায় (যিনি পাণ্ডিত্য ও সাধনার সূত্রে আশুতোষ তর্করত্ন নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন) এক অলৌকিক স্বপ্নদর্শন করেন। 

মার্কণ্ডেয় পুরাণ এবং শ্রীশ্রীচণ্ডীর ২২তম অধ্যায়ে মহিষাসুর বধের যে বিবরণ রয়েছে, সেখানে দেবাসুর সংগ্রামের চরম মুহূর্তে দেবী দুর্গার এক ভীষণ অথচ পরম অভয়দাত্রী সহস্রভুজা রূপের বর্ণনা মেলে। তর্করত্ন মহাশয় স্বপ্নাদেশে দেবীর ঠিক সেই রূপটিই দর্শন করেছিলেন।

কিন্তু স্বপ্নপূরণের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আর্থিক দীনতা। তান্ত্রিক সাধকের একাগ্র ইচ্ছা থাকলেও মন্দির গড়ে তোলার সামর্থ্য ছিল না। সেই সঙ্কটকালে এগিয়ে আসে শিবপুরের স্থানীয় হালদার পরিবার এবং এলাকার সাধারণ মানুষ। সকলের সমবেত প্রচেষ্টায় মাত্র ১২৫ টাকার বিনিময়ে কেনা হয় ৩ কাঠা জমি। সূচনা হয় এক নতুন অধ্যায়ের। 

তর্করত্ন মহাশয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী কুমোরটুলির তৎকালীন প্রখ্যাত মৃৎশিল্পী প্রিয়নাথ পাল দেবীর অদ্ভুত সেই মূর্তি গঠন করেন। বুদ্ধ পূর্ণিমার এক পবিত্র তিথিতে মাটির মন্দিরে সাড়ম্বরে প্রতিষ্ঠা হয় মূর্তির। কালক্রমে সেই কাঁচা মাটির কাঠামো ভেঙে পড়লে ইট, বালি, চুন ও সিমেন্টের সমন্বয়ে তৈরি হয় আজকের বিশালাকার পাকা মন্দিরটি। দেড় শতক অতিক্রান্ত হলেও প্রতিষ্ঠাতা আশুতোষ তর্করত্ন মহাশয়ের বংশধরেরাই প্রথা মেনে বংশানুক্রমে এই মন্দিরের সেবায়েত হিসেবে দায়িত্ব সামলে আসছেন।

আরও পড়ুন : মেদিনীপুরের ‘মোটা কালী’! কেন জনপ্রিয়?

শিবপুরের এই হাজার হাত কালীতলার প্রতিমা দর্শন করলে প্রথম দর্শনেই স্তম্ভিত হতে হয়। প্রচলিত কালীর মতো এখানে দেবী কৃষ্ণবর্ণা নন, বরং গাঢ় নীলকান্তি। প্রায় ২৫ ফুট উচ্চতার এই বিশাল বিগ্রহের গড়ন সাধারণ সর্বজনীন কালীমূর্তির চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন। 

কালীর প্রথাগত যে রূপের সঙ্গে মানুষ পরিচিত প্রসারিত জিহ্বা এখানে তা অনুপস্থিত। দেবীর মুখমণ্ডল প্রশান্ত ও গাম্ভীর্যপূর্ণ। আরও এক বিরল বৈশিষ্ট্য দেখা যায় চরণ বিন্যাসে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী মহাদেবের বক্ষোপরি দেবীর পদযুগল ন্যস্ত থাকলেও, এখানে মায়ের ডান পা স্থিত এক বিক্রমী সিংহের পিঠে এবং বাম পা শোভা পাচ্ছে সুবিশাল এক মহাপদ্মের ওপর। 

অর্থাৎ, দুর্গা ও কালীর এক পরম সমন্বয় ঘটেছে এই মূর্তিতে। মন্দিরে তন্ত্রমতে সাড়ম্বরে নিত্যপুজো ও বিশেষ তিথিতে আরাধনা হলেও, প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই এখানে কোনও দিন পশুবলির প্রথা চালু ছিল না। অহিংসা ও বিশুদ্ধ ভক্তিসাধনাই এই মন্দিরের মূল স্তম্ভ।

তবে এই মন্দিরের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অলৌকিকতা লুকিয়ে রয়েছে দেবীর বাহুমালায়। আক্ষরিক অর্থেই দেবীর হাজারটি হাত রয়েছে শরীর ঘিরে। স্থানীয় প্রবীণদের মুখে মুখে ফেরে এক প্রাচীন কথা— আজও নাকি দেবীর এই হাত সঠিকভাবে গণনা করা সম্ভব নয়। 

জনশ্রুতি বলে, বহু বছর আগে এক কৌতূহলী দর্শনার্থী দেবীর হাত গুনতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু দূর গণনার পর তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং গণনায় চরম বিভ্রান্তি ঘটে। সেই ঘটনার পর থেকে আর কেউ কখনও দেবীর হাত গোনার দুঃসাহস দেখাননি। বিশ্বাস ও ভয়ের এক অদৃশ্য বলয় আজও ঘিরে রেখেছে সেই হাজার হাতকে।

ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, হাওড়ার শিল্পাঞ্চলের আধুনিকীকরণের বহু আগে থেকেই শিবপুরের এই প্রাঙ্গণ ছিল তন্ত্রসাধকদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। আশুতোষ তর্করত্ন যে বৈপ্লবিক ভাবনায় শ্রীশ্রীচণ্ডীর বিশ্বরূপকে মৃণ্ময়ী থেকে মৃন্ময়ী ও পরে স্থায়ী রূপ দান করেছিলেন, তা বঙ্গীয় মূর্তিশিল্পের ইতিহাসেও এক বিরল ঘটনা। 

প্রতিদিন অগণিত ভক্ত দূর-দূরান্ত থেকে আসেন এই অপার্থিব রূপ দর্শন করতে। চাওয়া-পাওয়ার হিসেব ডিঙিয়ে শিবপুরের এই সহস্রভুজা কালীতলা কেবল এক ধর্মীয় স্থান হয়ে থাকেনি; তা হয়ে উঠেছে হাওড়ার প্রাচীন ইতিহাস, অপরিসীম মহিমা এবং বাঙালি সাধনার এক জীবন্ত দলিল।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *