বস্তার: মাওবাদের রক্তস্নাত অন্ধকার ঘুচে এ বার দেশের প্রতিটি প্রান্তে আলোর উৎসব পালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ ভীতিহীন পরিবেশে। গত চার দশকেরও বেশি সময়ে এই প্রথম, যখন একটিও মাওবাদী হামলায় প্রাণ হারাতে হয়নি দেশের কোনও সিআরপিএফ জওয়ানকে।
আর এই ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জনের পরই দীপাবলির পবিত্র দিনটিতে একেবারে মাওবাদীদের আঁতুড়ঘর বলে পরিচিত ছত্তীসগঢ়ের বস্তারে পা রাখলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। জওয়ানদের সঙ্গে আলোর উৎসব উদযাপনের পাশাপাশি বস্তারের মাটি থেকে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করলেন এক নতুন ও অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে।
অস্ত্রধারী মাওবাদীরা কোণঠাসা হয়ে পড়লেও, সমাজের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা ‘দিমাগি নকশাল’ বা তাত্ত্বিক উগ্রবাদীরা যে এখনও গণতন্ত্র ও সংবিধানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে দেশবাসীকে সজাগ থাকার কড়া বার্তা দিলেন তিনি।
রবিবার ছত্তীসগঢ়ের বস্তার অঞ্চলে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী চলতি বছরের দীপাবলিকে ‘অত্যন্ত বিশেষ’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর কথায়, “২০২৬ সালের এই দীপাবলি প্রকৃত অর্থেই অনন্য। কারণ, এটাই প্রথম দেওয়ালি, যখন আমাদের দেশ নকশাল ও মাওবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দশকের লড়াইয়ে সম্পূর্ণ জয়লাভ করেছে। দেশের প্রতিটি জেলা আজ নকশালমুক্ত এবং কোটি কোটি নাগরিক ভয়ের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে আলো উৎসবে মেতেছেন।”
বস্তারের মাটিকে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১০ সালে এই দান্তেওয়ারার বুকেই শহিদ হতে হয়েছিল ৬৬ জন সিআরপিএফ জওয়ান ও ৪৪ জন সাধারণ নাগরিককে। অতীতে যেখানে বছরে প্রায় দু’হাজারেরও বেশি মাওবাদী হামলা সংঘটিত হত এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে জওয়ানদের বলিদানের সংখ্যা খতম হওয়া উগ্রবাদীদের থেকেও বেশি ছিল, সেখান থেকে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে একমাত্র সরকারের দৃঢ় সদিচ্ছা ও নিরাপত্তা বাহিনীর অসামান্য বীরত্বের সুবাদে।
আরও পড়ুন: দীপাবলিতে এবারও সীমান্তে প্রধানমন্ত্রী! দেশবাসীকে বার্তা মোদীর
প্রধানমন্ত্রী পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, ২০০৪ থেকে ২০১৩ সালের সেই অন্ধকার যুগ পার করে গত এক বছরে দেশের ইতিহাসে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে গত ৪৭ বছরে এই প্রথমবার কোনও সিআরপিএফ জওয়ান ডিউটিরত অবস্থায় মারা যাননি। এ
ই অর্জনকে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতি এবং জওয়ানদের সাহসিকতা ও সংযমের জয় বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১ কোটি ৪০ কোটি দেশবাসীর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাতেই তিনি আজ বস্তারের জওয়ানদের কাছে ছুটে এসেছেন।
তবে এই বিরাট সাফল্যের মধ্যেও নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জের কথা মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি প্রধানমন্ত্রী। অস্ত্রধারী মাওবাদীদের খতম করার পর এ বার দেশের সামনে নতুন বিপদ হিসেবে মাথা চাড়া দিয়েছে ‘দিমাগি নকশাল’ বা বুদ্ধিজীবী উগ্রবাদীরা।
মোদীর অভিযোগ, এই তাত্ত্বিক নকশালরা নানা রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের অন্দরে অনুপ্রবেশ করে আজও সাধারণ মানুষকে সংবিধান ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে উসকানি দিয়ে চলেছে। তাদের চিহ্নিত করে পরাজিত করার মাধ্যমেই দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা সম্ভব।
সম্প্রতি বিরোধী রাজনৈতিক দলের আক্রমণ ও বিতর্কিত রাজনৈতিক গোষ্ঠী ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র আর্থিক অনুদান এবং বিদেশি এনজিও-র মাধ্যমে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টার প্রসঙ্গও ঘুরিয়ে উঠে আসে এ দিনের বক্তব্যে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বস্তারের বুক থেকে প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তা কেবল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় দেশের বিজয়কেই সিলমোহর দিল না, বরং আগামী দিনে দেশের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা বুদ্ধিজীবী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক কড়া রাজনৈতিক রূপরেখাও তৈরি করে দিল।
Leave a comment