চট্টগ্রাম: তথাকথিত ছাত্র আন্দোলনের 'সাফল্যের পর' বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে শান্তি-শৃঙ্খলা ফেরার আশা করা হয়েছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) পরিস্থিতি এখন ঠিক উল্টো। ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’র ভেক ধরে শিক্ষকদের একের পর এক হেনস্থা করার অভিযোগ উঠছে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে। এমনকী, খোদ উপাচার্যকেও তাঁর ঘরে ঢুকে শাসানোর মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে! অভিযোগ, এই পুরো বিশৃঙ্খলার নেপথ্যে রয়েছে ছাত্রশিবির নিয়ন্ত্রিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’-এর নেতারা।
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের জুলাই মাসে। চবি উপাচার্যের ঘরে ঢুকে একদল পড়ুয়া তাঁকে রীতিমতো তর্জনী উঁচিয়ে শাসায়। তাদের সাফ কথা ছিল, “আপনি নিজের যোগ্যতায় বসেননি, আমরা বসিয়েছি। তাই আমাদের কথা শুনতে আপনি বাধ্য।” শুধু উপাচার্য নন, এরপর টার্গেট করা হয় ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক রন্টু দাশ ও সংস্কৃত বিভাগের কুশলবরণ চক্রবর্তীকে। কুশলবাবুকে তো প্রশাসনিক ভবনে তিনঘণ্টা আটকে রেখে হেনস্থা করা হয় বলে অভিযোগ।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে আইন বিভাগের শিক্ষক হাসান মহম্মদ রোমানকে নিয়ে। অভিযোগ, গত ১০ জানুয়ারি তাঁকে রীতিমতো তাড়া করে পাকড়াও করে একদল পড়ুয়া। এরপর জোর করে তাঁকে প্রক্টর অফিসে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে রাখা হয়। এই ঘটনার নেতৃত্বে ছিলেন চাকসু-র (ছাত্র সংসদ) দফতর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান, মাসুম বিল্লাহ-সহ আরও কয়েকজন। উল্লেখ্য, এঁরা সকলেই শিবির সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত। যদিও শিক্ষক রোমানের দাবি, তিনি জুলাই আন্দোলনের সময় কোনও বিতর্কিত ভূমিকায় ছিলেন না এবং কোনও পড়ুয়াকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তেও তাঁর হাত ছিল না।
এইসব ঘটনার অনুসন্ধানে উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সাধারণ পড়ুয়াদের ব্যানারে এই তথাকথিত আন্দোলনগুলি চললেও সামনের সারিতে থাকা মুখগুলি মূলত ছাত্রশিবিরের পদাধিকারীদের। উপাচার্যকে হেনস্থার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন চবি শিবিরের সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ পারভেজ এবং প্রচার সম্পাদক ইসহাক ভূঁইয়া। বিশ্লেষকদের মতে, ‘মব কালচার’ বা ভিড়ের দোহাই দিয়ে আসলে নিজেদের রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করতে চাইছে শিবির।
আশ্চর্যের বিষয় হল, বারবার শিক্ষক হেনস্থার ঘটনা ঘটলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনও পর্যন্ত কার্যত ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ হয়ে বসে আছে। রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মহম্মদ সইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, তাঁদের কাছে কোনও লিখিত অভিযোগ আসেনি। উপ-উপাচার্য মহম্মদ কামালউদ্দিনও একই সুরে কথা বলেছেন। প্রশাসনের এই গা বাঁচানো মনোভাবে সাধারণ শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, “এখন ক্লাসে যেতেও ভয় লাগছে। কখন কাকে ‘দালাল’ অপবাদ দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে, তার ঠিক নেই।”
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর চট্টগ্রাম শাখার সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী এই ঘটনাকে ‘ভয়াবহ দৃষ্টান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, কোনও শিক্ষক দোষ করলে আইনি পথে বিচার হতে পারে। কিন্তু ছাত্ররা শিক্ষককে শাসন করবে— এই সংস্কৃতি সমাজের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।
যদিও চাকসু ভিপি ইব্রাহিম রনি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, “যাঁরা পড়ুয়াদের জীবন নষ্ট করেছেন, শিক্ষার্থীরা তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন মাত্র।” তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই এভাবে ‘বিচার’ করার অধিকার ছাত্রদের আছে কিনা, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে।

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন