বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে— যখন কোনো ছোট বা মধ্যম শক্তির দেশ একটি পরাশক্তির কৌশলগত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তখন তার পরিণতি কী হয়? সাদ্দাম হোসেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফি, ইরানের খোমেনি ধারাবাহিকতা। এবং দক্ষিণ এশিয়ায়—শেখ মুজিবুর রহমান, পরে শেখ হাসিনা। এগুলো কি নিছক আলাদা আলাদা ঘটনা? নাকি একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ধারাবাহিকতার অংশ?
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল পাকিস্তানপন্থী—এটা ঐতিহাসিকভাবে নথিভুক্ত। স্বাধীনতার পরও মুক্তিযুদ্ধের নেতা ও তার দল আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্ক কখনো উষ্ণ হয়নি আমেরিকার। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তার কণ্যার সময়কালে শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বিশ্লেষক বলেন, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের প্রসঙ্গ একাধিকবার উঠেছিল। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি স্বীকৃত নয়, তবুও এই প্রশ্ন রাজনৈতিক আলোচনায় ছিল। সয়ং শেখ হাসিনা তার সরকারের পতনের আগে ও পরে বলছেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট— শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হন। এটা কি কেবল অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র ছিল? নাকি আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির অদৃশ্য প্রভাবও ছিল? এই প্রশ্ন আজও ইতিহাসবিদদের আলোচনায়। কিছু রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও লেখক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ১৯৭৫ এর পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত ছিল। এ বিষয়ে কোনো প্রমাণিত দলিল প্রকাশ না হলেও বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মার্কিন প্রশাসনের দ্রুত বাস্তববাদী কূটনৈতিক অবস্থান অনেকের সন্দেহ বাড়ায়।
এর পর শেখ হাসিনার রাজনৈতিক আগমন। শেষ সময়ে শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিলেন। তার শাসনামলে বাংলাদেশ উন্নয়ন, অবকাঠামো ও কৌশলগত ভারসাম্যের রাজনীতি অনুসরণ করেছে। তিনি একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছেন— “সেন্ট মার্টিন দিলে আমি সারাজীবন ক্ষমতায় থাকতে পারতাম।” এই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য কী? এটি কি কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল? নাকি আন্তর্জাতিক চাপের ইঙ্গিত? ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তার সরকারের পতন ঘটে। সমর্থকেরা বলেন— এটি ছিল পরিকল্পিত ক্ষমতাচ্যুতি।
ড. মুহাম্মদ ইউনুস আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি নাম। তার পশ্চিমা বিশ্বে গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলক বেশি। তাকেই বানানো হলো সরকার প্রধান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ বৃদ্ধি, উচ্চপর্যায়ের সফর, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ইস্যুতে সরব অবস্থান, অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে আলোচনার তৎপরতা। সমালোচকেরা এটাকে বলেন “খবরদারি”। এটাই ত প্রমান দেয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আর্ন্তজাতিক ষড়যন্ত্রের। সাদ্দাম হোসেন—মার্কিন নীতির বিরোধিতা করেছিলেন। গাদ্দাফি—পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছিলেন। ইরানের নেতৃত্ব—দশকের পর দশক আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এই নেতাদের পরিণতি কেমন হয়েছিল, তা বিশ্ব দেখেছে। ইতিহাসে একটি প্যাটার্ন কি দেখা যায়? যারা কৌশলগতভাবে আমেরিকার অবস্থান প্রত্যাখ্যান করেছেন—তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কি টেকেনি? এই প্রশ্নের সরল উত্তর নেই। কিন্তু তুলনা আছে। ধারাবাহিকতা আছে।
শেখ হাসিনার পতনের পর একটি বিষয় পরিষ্কার— ভারত তার পাশে ছিল। যদি সেই সমর্থন না থাকত? ইতিহাস কি ভিন্ন পথে যেত? দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত একটি আঞ্চলিক শক্তি। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বহুস্তরীয়—নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সংযোগ, প্রতিরক্ষা। কিছু বিশ্লেষকের মতে— ভারতের অবস্থান শেখ হাসিনার জন্য একটি “কৌশলগত সেফটি নেট” তৈরি করেছিল। না হলে বাবার পরিনতিই ভোগ করতে হতো হাসিনাকে। আর বঙ্গোপসাগর এখন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ। যদি সেন্ট মার্টিনে কোনো বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপিত হতো—তাহলে বাংলাদেশ কি বৃহত্তর সামরিক জোট-সংঘাতে জড়িয়ে পড়ত? ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
শেখ হাসিনা এই ইস্যুতে সচেতনভাবে নিরপেক্ষতার পথ বেছে নিয়েছিল? আর সেটিই ছিল আমেরিকার সাথে রাজনৈতিক সংঘাতের মূল কারণ? ইতিহাস কখনও সরলরৈখিক নয়। শেখ মুজিব থেকে শেখ হাসিনা— বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তির প্রভাবের প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে। তাই বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড বা শেখ হাসিনার পতন একটি ষড়যন্ত্রের গন্ধ আসে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট— ছোট রাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মূল্য কখনও কখনও বড় হয়। ইতিহাস শেষ কথা বলেনি। সময়ই বলবে— এই অধ্যায়কে ভবিষ্যৎ কীভাবে মূল্যায়ন করবে।

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ মার্চ ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন