বিপ্লবী থেকে সুপ্রিম লিডার: আয়াতোল্লাহ খামেনেইয়ের উত্থান ও এক বিতর্কিত অধ্যায়ের অবসান
তেহরান, ১ মার্চ ২০২৬: দীর্ঘ কয়েক দশকের একচ্ছত্র শাসনের পর অবসান হলো আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের জমানার। আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ অভিযানে সপরিবারে নিহত হয়েছেন ইরানের এই সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। রবিবার তেহরান এই খবর নিশ্চিত করার পর দেশজুড়ে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং ৭ দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু কে ছিলেন এই খামেনেই? কীভাবে একজন সাধারণ বিপ্লবী থেকে তিনি হয়ে উঠলেন ইরানের ‘সর্বোচ্চ ঈশ্বর’?[TECHTARANGA-POST:6855]১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল ইরানের মাশহাদ শহরের এক রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবারে জন্ম খামেনেইয়ের। শিয়া ইসলামি চিন্তাধারায় বড় হওয়া খামেনেই যৌবনে পা দিয়েই জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে তৎকালীন শাহ মহম্মদ রেজা পাহলভির অপশাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। আয়াতোল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির বিপ্লবী আদর্শে অনুপ্রাণিত খামেনেইকে এই সময় একাধিকবার কারাবরণ করতে হয় এবং অকথ্য নির্যাতনের শিকার হতে হয়।[TECHTARANGA-POST:6854]১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইসলামি বিপ্লবের পর খামেনেইয়ের রাজনৈতিক উত্থান দ্রুত গতিতে হতে থাকে। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট আসে ১৯৮৯ সালে। প্রতিষ্ঠাতা নেতা রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর সংবিধান সংশোধন করে তাঁকে 'সুপ্রিম লিডার' বা সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করা হয়। যদিও সে সময় তাঁর ধর্মীয় শাস্ত্রীয় মর্যাদা (মারজা) নিয়ে বিতর্ক ছিল, কিন্তু কৌশলগত দক্ষতায় তিনি নিজেকে ইরানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।[TECHTARANGA-POST:6853]সুপ্রিম লিডার হিসেবে খামেনেই ছিলেন ইরানের সর্বেসর্বা। ইরানের দুর্ধর্ষ রেভোলিউশনারি গার্ড ছিল তাঁর সরাসরি আজ্ঞাবহ। প্রেসিডেন্ট বা সংসদের ঊর্ধ্বে থেকে তিনি দেশের বিদেশনীতি ঠিক করতেন। হিজবুল্লাহ, হুথি এবং সিরিয়া-ইরাকের শিয়া গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আধিপত্য কায়েম করেছিলেন তিনি।[TECHTARANGA-POST:6852]খামেনেইয়ের দীর্ঘ শাসনকাল বিতর্কমুক্ত ছিল না। ২০০৯ সালের নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগ থেকে শুরু করে ২০২২-২৩ সালের হিজাব বিরোধী আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমন করেছেন তিনি। মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া বিক্ষোভে অতিরিক্ত বল প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর কঠোর পশ্চিমা-বিরোধী অবস্থান এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে জেদ ইরানকে আন্তর্জাতিক মহলে একঘরে করে তুলেছিল।[TECHTARANGA-POST:6851]মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খামেনেইকে ‘ইতিহাসের অন্যতম শয়তান মানুষ’ বলে উল্লেখ করলেও ইরানের একটি বড় অংশের কাছে তিনি ছিলেন দেবতুল্য। তাঁর মৃত্যুতে একদিকে যখন শোকের ছায়া, অন্যদিকে তেহরানের অলিগলিতে গোপনে উৎসব পালনের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। আপাতত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বাধীন কাউন্সিল দেশ চালালেও, খামেনেই বিহীন ইরান আগামীর পথে কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে প্রবল অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।