স্কুলে যেতে একমাত্র ভরসা কলার ভেলা !
মথুরাপুর: আধুনিক ভারতে ডিজিটাল শিক্ষার ঢোল পেটানো হলেও, তার উল্টো পিঠের এক করুণ ও কঙ্কালসার ছবি ফুটে উঠল দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুরে। জ্ঞানার্জনের জন্য বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়াই যেখানে এক বিরাট যুদ্ধ। সেখানে শিক্ষার আলো পৌঁছানোটাই যেন এক মস্ত বড় প্রশ্নচিহ্ন! মথুরাপুরের তেঁতুলবেড়িয়া অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খুদে পড়ুয়াদের স্কুলে পৌঁছানোর একমাত্র ভরসা এখন কলার ভেলা। বর্ষা এলেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কলার ভেলায় চেপে জলে ভেসে স্কুলে যেতে বাধ্য হচ্ছে এই কোণঠাসা শিশুরা।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বছরের প্রায় ছয়টি মাসই স্কুলের সংযোগকারী মূল রাস্তাটি হাঁটুজলে ডুবে থাকে। তবে বর্ষার দিনগুলোতে পরিস্থিতি রূপ নেয় আরও ভয়ানক। জল এতটাই বাড়ে যে ছোট ছোট বাচ্চাদের পক্ষে হেঁটে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব। ফলে প্রতিদিনের পড়াশোনা টিকিয়ে রাখতে কলার গাছ দিয়ে তৈরি ভেলাই হয়ে উঠেছে তাদের একমাত্র পারাপারের মাধ্যম।অনেক সময় জলের ভয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আর স্কুলে যেতে চায় না। বাধ্য হয়ে অভিভাবকেরা কাজ ফেলে সন্তানদের হাত ধরে কোমরজল পেরিয়ে স্কুলে দিয়ে আসেন। কখনো আবার তুলনামূলক বড় পড়ুয়ারা কলার ভেলা টেনে ছোটদের পারাপার করায়। এই ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াতে প্রায়শই ঘটে বিপত্তি। অসাবধানতাবশত যদি কোনো শিশু জলে পড়ে যায় বা বই-খাতা ভিজে যায়, তবে সেদিনের মতো তার পড়াশোনার পাঠ ওখানেই শেষ!ভোগান্তির শেষ এখানেই নয়। স্কুলের ভৌগোলিক যাতায়াত ব্যবস্থার পাশাপাশি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে আস্ত স্কুল ভবনটিও। দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনের একাংশ ইতিমধ্যে ভেঙে পড়েছে। ফলে চরম ঝুঁকি নিয়ে মাত্র একটিমাত্র ক্লাসরুমেই গাদাগাদি করে চলছে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণির পঠনপাঠন। তার ওপর বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে পানীয় জলের একমাত্র নলকূপটি। তীব্র গরম ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে পানের যোগ্য এক ফোঁটা জলের জন্যও হাহাকার করতে হয় এই অবোধ শিশুদের।এলাকাবাসীদের চরম অভিযোগ, গত আট বছর ধরে এই নারকীয় দুর্ভোগ সহ্য করতে হচ্ছে তাঁদের। প্রশাসনিক কার্যালয় থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি—সব দরজায় বারবার দরবার করেও আজ পর্যন্ত মেলেনি কোনো স্থায়ী সমাধান। সরকারি উদাসীনতা ও পরিকাঠামোগত এমন করুণ দশার কারণে দিনের পর দিন কমছে স্কুলের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা।স্কুলের শিক্ষিকারা চরম দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে দ্রুত রাস্তা সংস্কার, ভবন মেরামতি এবং পানীয় জলের সুব্যবস্থার জন্য প্রশাসনের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন। যে ঐতিহ্যবাহী স্কুলে একসময় এলাকার বহু মানুষ পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, আজ সেই স্কুলেই শিক্ষার আলো জ্বলতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কলার ভেলা। প্রশ্ন উঠছে, আধুনিকতার যুগে আর কতদিন এই জীবনঝুঁকি নিয়ে ভাসতে হবে দক্ষিণ ২৪ পরগনার আগামী প্রজন্মকে?