সপ্তম বেতন কমিশন ও অতিরিক্ত ৪% ডিএ-র ‘টোপ’! সুপ্রিম ধাক্কায় বেসামাল মমতা সরকারের ড্যামেজ কন্ট্রোল?
কলকাতা: ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটের মুখে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে বড় চাল চালল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। বৃহস্পতিবার রাজ্য বাজেটে বহুল প্রতীক্ষিত সপ্তম বেতন কমিশন (7th Pay Commission) গঠনের ঘোষণা করলেন রাজ্যের অর্থ প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। একইসঙ্গে, রাজ্য সরকারি কর্মীদের মহার্ঘ্য ভাতা বা ডিএ আরও ৪ শতাংশ বৃদ্ধির কথা জানানো হয়েছে। তবে, এই ঘোষণা ঘিরেই দানা বেঁধেছে বিতর্ক। ওয়াকিবহাল মহলের প্রশ্ন, একে কি প্রকৃত ‘সুখবর’ বলা চলে? নাকি শীর্ষ আদালতের কঠোর রায়ের পর মুখরক্ষায় এটি কেবলই একটি ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ বা ক্ষত প্রলেপের চেষ্টা?বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের জন্য একগুচ্ছ ঘোষণা করা হয়েছে, যা ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। যার জেরে রাজ্য সরকারি কর্মীদের ডিএ আরও ৪ শতাংশ বেড়ে ১৮ শতাংশ থেকে ২২ শতাংশে পৌঁছল। সেইসঙ্গে, দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর অবশেষে নতুন বেতন কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য। যার লক্ষ্য হল - মূল বেতন, গ্রেড পে এবং অন্যান্য ভাতা কাঠামোর পুনর্গঠন করা। [TECHTARANGA-POST:6283]তথ্যাভিজ্ঞ মহলের মতে, এই ঘোষণার সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কাকতালীয়ভাবে, আজই সুপ্রিম কোর্ট ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বকেয়া ডিএ মামলায় ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে। শীর্ষ আদালত সাফ জানিয়েছে, আগামী ৬ সপ্তাহের মধ্যে বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ মিটিয়ে দিতে হবে রাজ্য সরকারকে। বাকি বকেয়া মেটানোর প্রক্রিয়া তদারকি করতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিও গঠন করা হয়েছে।উল্লেখ্য, বছরের পর বছর ধরে যে বকেয়া ডিএ-কে রাজ্য সরকার ‘ঐচ্ছিক’ বা ‘দয়ার দান’ বলে কার্যত এড়িয়ে এসেছে, আদালতের সেই চপেটাঘাত খাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাজেট ঘোষণায় ডিএ বৃদ্ধি এবং নতুন বেতন কমিশনের প্রতিশ্রুতি আসলে রাজ্য সরকারের কোণঠাসা অবস্থাকেই তুলে ধরছে বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা।রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপে খুশি হওয়ার বদলে অনেকেই এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সমালোচনার প্রধান দিকগুলো হল, ৪ শতাংশ ডিএ বাড়লেও কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের কর্মীদের ডিএ-র ব্যবধান এখনও আকাশছোঁয়া। ২২ শতাংশ ডিএ দিয়ে এই বিশাল শূন্যস্থান পূরণ করা কার্যত অসম্ভব। তাছাড়া, নতুন ৪ শতাংশ ঘোষণার আড়ালে পুরোন পাহাড়প্রমাণ বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার কোনও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাজেটে নেই। আদালতের নির্দেশে ২৫ শতাংশ মেটাতে হলেও, বাকি অংশের ভবিষ্যৎ এখনও অন্ধকারে।খুব সম্ভব, ২০২৬-এর মে মাসেই রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তার আগে ফেব্রুয়ারি মাসের বাজেটে এই ঘোষণা কেবল ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা কিনা, তা নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করেছেন বিরোধী নেতারা। ৫ বছর অন্তর যেখানে বেতন কমিশন হওয়ার কথা, সেখানে ২০১৫-র পর ২০২৬-এ এসে কমিশন গঠনের ঘোষণা রাজ্যের চরম প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতারই প্রমাণ বলে মনে করছেন তাঁরা। সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের দীর্ঘ লড়াই এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনি চাপের মুখে রাজ্য সরকার যে কিছুটা নমনীয় হতে বাধ্য হয়েছে, তা স্পষ্ট। তবে, কেবল ৪ শতাংশ ডিএ বা একটি নতুন কমিশনের আশ্বাসে বাংলার বঞ্চিত সরকারি কর্মচারীরা শান্ত হবেন কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আদালতের নজরদারিতে বকেয়া টাকা আদায়ই এখন কর্মচারীদের প্রধান লক্ষ্য।