ইউনুস সরকারের মার্কিন চুক্তি, বছরে ১৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি বাংলাদেশের
ঢাকা: বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তিকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানিয়েছে, ইউনুস সরকারের সময়ে করা এই চুক্তির কারণে বাংলাদেশ সরকার বছরে প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা রাজস্ব হারাতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু রাজস্ব ক্ষতির বিষয় নয়, বরং দেশের বাণিজ্য নীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপরও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।[TECHTARANGA-POST:7156]মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির আয়োজিত “২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট সুপারিশ” শীর্ষক রাউন্ডটেবিল বৈঠকে এই তথ্য তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।একতরফা সুবিধা?সিপিডির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট’-এর আওতায় আমেরিকা থেকে প্রায় ৪,৫০০ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে বাংলাদেশকে। এছাড়া আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আরও ২,২১০ পণ্যে শুল্ক ছাড় দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে।ফলে প্রতি বছর আমদানি শুল্ক বাবদ সরকারের প্রায় ১,৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।অর্থনীতিবিদদের মতে, এই চুক্তি অনেকটাই একতরফা বাজার সুবিধা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য, যা দেশের বাণিজ্য ভারসাম্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।ডব্লিউটিও নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক?সিপিডির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই ধরনের একতরফা শুল্কমুক্ত সুবিধা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO)-এর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। কারণ, ডব্লিউটিও নিয়ম অনুযায়ী এক দেশের জন্য বিশেষ সুবিধা দিলে অন্য সদস্য দেশগুলোকেও একই সুবিধা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে।এতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ওপর আরও বড় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।সার্বভৌমত্ব নিয়েও প্রশ্নসিপিডির সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিশ্ব রাজনীতিতে এখন বাণিজ্যকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে সব শর্ত জনসমক্ষে আনা জরুরি।তার মতে, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট পণ্য কেনার শর্ত থাকলে তা বাস্তবায়নে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতে পারে। এতে সরকারি ব্যয় আরও বাড়বে এবং অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হবে।তিনি আরও বলেন, এই ধরনের শর্ত ভবিষ্যতে কোন দেশ থেকে পণ্য কেনা যাবে বা যাবে না—এমন প্রশ্নও তৈরি করতে পারে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপসিপিডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরেই রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২.৯ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪.৫ শতাংশ।রাজস্ব ঘাটতি ইতোমধ্যে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ফলে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ব্যাপক ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে।ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা আর্থিক খাতে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে।মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি ঝুঁকিঅর্থনীতিবিদদের মতে, ইতোমধ্যে দেশে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।একই সময়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা গেছে। জানুয়ারি পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০.৩ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।পুনর্মূল্যায়নের দাবিসিপিডি মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা এই বাণিজ্য চুক্তি এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা করারও পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।[TECHTARANGA-POST:7145]অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের রাজস্ব ঘাটতি, বাড়তি ব্যয় এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্যের ওপর চাপ—সব মিলিয়ে এই চুক্তি ইউনুস সরকারের অর্থনৈতিক নীতির ওপর বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।