নয়াদিল্লি: এসআইআরের নামে ব্যাপক ‘ভোটচুরি’র অভিযোগ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সোমবার চরম রাজনৈতিক উত্তেজনার সাক্ষী থাকল ভারতের রাজধানী দিল্লি। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কড়া বার্তা এবং সাক্ষাৎদানের আর্জি খারিজ হওয়ার পরেও নিজেদের কর্মসূচি থেকে একচুলও সরে দাঁড়াননি বিরোধীরা। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, কংগ্রেসের শীর্ষনেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নেতৃত্বে এবং ইন্ডি জোটের তাবড় নেতাদের উপস্থিতিতে শুরু হয় ঐতিহাসিক ‘সুপ্রিম কোর্ট অভিযান’। প্রাথমিক পর্যায়ে বাস বা গাড়িতে করে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও, শেষ পর্যন্ত পুলিশি বাধা ও সুরক্ষার কড়াকড়িকে এড়িয়ে পায়ে হেঁটে সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে রওনা দেন রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা। তাঁদের সঙ্গে মিছিলে পা মেলাতে দেখা যায় বাম যুবনেত্রী নেহা বোরা সহ একাধিক বিরোধী মুখকে।রবিবারই বিরোধী জোট ‘ইন্ডি’র পক্ষ থেকে এই সুপ্রিম কোর্ট অভিযানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়েছিল। ঠিক হয়েছিল, দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তর সঙ্গে দেখা করে একটি স্মারকলিপি জমা দেবেন রাহুল গান্ধী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদবরা। কিন্তু রবিবার রাতেই সুপ্রিম কোর্টের তরফে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয় যে, বিচারাধীন বিষয় এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য প্রধান বিচারপতি কোনো সময় দিতে পারবেন না। আদালত রাজনীতির জায়গা নয় বলেও কড়া বার্তা দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও আন্দোলন বাতিল না করে বিরোধীরা আদালতের পথে পা বাড়ান। মিছিলে অংশ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ তাঁদের ভোটাধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েছেন এবং সেই বঞ্চিত মানুষের সাংবিধানিক অধিকার ফিরিয়ে দিতেই তাঁরা রাজপথে নেমেছেন। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ সম্ভব না হলেও, শেষ পর্যন্ত রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে দশজনের একটি প্রতিনিধি দল সুপ্রিম কোর্টে একটি বিশেষ পিটিশন বা আবেদনপত্র জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।অন্যদিকে, বিরোধী এই মেগা অভিযানের ঠিক সমান্তরালেই সাংবাদিক বৈঠক করে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে শাসক দল বিজেপি। জ্যেষ্ঠ গেরুয়া নেতা শিবরাজ সিং চৌহান হুংকার দিয়ে বলেন যে, ইন্ডি জোট দেশের সংবিধানকে অপমান করছে এবং তারা সরাসরি ‘বিদেশি শক্তির হাতের পুতুল’-এ পরিণত হয়েছে। অতীতে রাহুল গান্ধীর ‘রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই’ সংক্রান্ত মন্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি দাবি করেন, এই ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী ও জনবিরোধী রাজনীতির জন্যই ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কংগ্রেস চিরতরে মুছে যাবে। বিরোধীদের এই কর্মসূচিকে দমাতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইতিমধ্যেই রাজধানীতে প্রায় ২০ হাজার আধাসেনা বা প্যারামিলিট্রি ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, রাজধানীর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখতে এই বিপুল পরিমাণ আধাসেনার মেয়াদে আরও এক মাস সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।এদিকে সমস্ত হুমকি ও প্রশাসনিক কড়াকড়িকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের এক্স (পূর্বতন টুইটার) হ্যান্ডেলে রাহুল গান্ধী এক বিস্ফোরক পোস্ট করে লিখেছেন, ‘শিবের তাণ্ডব নৃত্য শুরু হয়ে গিয়েছে। এই অবস্থায় কোনো পরিকল্পনা থাকে না। এটা শিবের মিছিল, যে কেউ আসতে পারেন, আমি কাউকে আটকাব না।’ একদিকে আদালতের কড়া অবস্থান, অন্যদিকে রাজপথে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা সহ বিরোধী নেতাদের পায়ে হেঁটে আন্দোলন এবং চত্বরে কুড়ি হাজার আধাসেনার পাহারা—সব মিলিয়ে রাজধানী দিল্লির রাজনৈতিক পারদ এখন চরম সীমায় পৌঁছেছে।