বোলপুর: বিশ্বভারতীর শান্তিনিকেতনে এবার এক মস্ত বড় অ্যাকশনে নামল প্রশাসন। কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত শান্তিনিকেতনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ সোনাঝুরি জঙ্গলে সোমবার সকাল থেকেই চলল বন দফতরের বুলডোজার। জঙ্গল বাঁচাতে এবং তার পরিবেশ রক্ষা করতে একপ্রকার যুদ্ধং দেহি মেজাজে ময়দানে নেমেছেন আধিকারিকেরা। সোনাঝুরি জঙ্গলের বুক চিরে যাতে কোনোভাবেই পর্যটকদের চারচাকা গাড়ি ভেতরে ঢুকে গাছপালার ক্ষতি করতে না পারে, তার জন্য এদিন মাটি কেটে ভেতরের সমস্ত রাস্তা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হল। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে জঙ্গল লাগোয়া রাস্তার দুই ধারে নিয়ম বহির্ভূতভাবে গজিয়ে ওঠা কয়েকশো হোটেল ও রিসর্টের কংক্রিট ঢালাই করা পেল্লাই সব বিজ্ঞাপনী সাইনবোর্ড ও লোহার বোর্ড বুলডোজার দিয়ে উপড়ে গুঁড়িয়ে ফেলা হলো। বোলপুরের বন দফতরের রেঞ্জার জ্যোতিষ বর্মনের নেতৃত্বে এবং শান্তিনিকেতন থানার ওসি অনন্যা দে-র উপস্থিতিতে এই বিশাল উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে এদিন এলাকায় তুমুল চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।[TECHTARANGA-POST:9474]আসলে শান্তিনিকেতনে আগত দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে সোনাঝুরি জঙ্গলের খোয়াই হাট এক অন্যতম বড় আকর্ষণ। কিন্তু বন দফতরের নিয়ম অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সরকারি জায়গায় কোনোভাবেই কোনো বাণিজ্যিক হাট বসানোর নিয়ম নেই। ফলে এই হাটটি আইনিভাবে সম্পূর্ণ 'বেআইনি'। হাটের পরিধি বাড়ার সাথে সাথে সেখানে যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলা এবং গাড়ির ধোঁয়ায় বনের পরিবেশ ও গাছপালা ধ্বংস হচ্ছিল। এই চরম উদাসীনতার বিরুদ্ধে জাতীয় পরিবেশ আদালতে এক মামলা রুজু করেন বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্ত, যার রায়দান এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। আদালতও স্পষ্ট জানতে চেয়েছিল যে রাজ্য সরকারের ঠিক কোন দফতরের নির্দেশে এই বনাঞ্চলে হাট বসে, যার সদুত্তর কেউ দিতে পারেনি। তবে এদিন বন দফতরের এই কড়া পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন সোনাঝুরি হাটের দায়িত্বে থাকা সুকেশ চক্রবর্তী এবং হোটেল ব্যবসায়ী গণেশ ঘোষেরা। তাঁদের দাবি, হাটে চারচাকা গাড়ি ঢোকা বন্ধের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ভালো, তবে তাঁদের ব্যবসার দিকটাও যেন প্রশাসন একটু নজরে রাখে।[TECHTARANGA-POST:9473]স্থানীয় প্রবীণদের সূত্রে জানা গিয়েছে, আনুমানিক ২০০০ সালে প্রয়াত আশ্রমিক শ্যামলী খাস্তগীরের উদ্যোগে সোনাঝুরি জঙ্গলে গুটিকয়েক আদিবাসী শিল্পী এবং বিশ্বভারতীর কলাভবনের পড়ুয়াদের তৈরি হস্তশিল্প নিয়ে সপ্তাহে মাত্র একদিন, অর্থাৎ শনিবার এই হাট বসত। যার পোশাকি নাম ছিল ‘শনিবারের হাট’। কিন্তু রাজ্যে তৃণমূল সরকার আসার পর থেকেই এই হাটের পরিবেশ ও রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায়। সপ্তাহে একদিনের বদলে সাতদিনই হাট বসতে শুরু করে এবং আদিবাসী শিল্পীদের হটিয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করে বহিরাগত ব্যবসায়ীরা। সবচেয়ে বড় অভিযোগ, এই হাট থেকে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যে বিপুল পরিমাণ টাকা তোলা হতো, তা সরকারের কোনো খাতেই জমা পড়ত না। এছাড়া হাটে আসা গাড়ি রাখার জন্য স্থানীয় তৃণমূল নেতা নিমাই দাস একটি বেআইনি পার্কিং জোন বানিয়ে মোটা টাকা কামাতেন বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, সোনাঝুরির এই ঐতিহ্যবাহী হাট কার্যত দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছিল।[TECHTARANGA-POST:9472]রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন অর্থাৎ বিজেপির নতুন সরকার আসার পরেই সোনাঝুরির জঙ্গল ও পরিবেশ বাঁচাতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে বন দফতর। এর আগেই বিজেপির নেতা-কর্মীরা ওই এলাকার তৃণমূল নেতার তৈরি করা বেআইনি পার্কিং জোনটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিলেন, আর এবার খোদ বুলডোজার চালিয়ে চিরতরে বন্ধ করা হলো গাড়ির অনুপ্রবেশ। তবে সোনাঝুরিতে এই মেগা বুলডোজার অভিযান প্রসঙ্গে বন দফতরের কোনো আধিকারিকই সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেননি। কারণ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কড়া বিজ্ঞপ্তি জারি করে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, সরকারি কর্মী বা উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা সংবাদমাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বিষয়ে সরাসরি বক্তব্য দিতে পারবেন না। ফলে মুখ কুলুপ আঁটলেও, কাজে যে নতুন সরকার জঙ্গল মাফিয়া ও দুর্নীতিবাজদের এক ইঞ্চি জমিও ছাড়বে না, তা এদিনের ঘটনাতেই পরিষ্কার।
প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার