নরেন্দ্র মোদীর ইসরায়েল সফর: নীতির ধারাবাহিকতা, কৌশলগত বিচ্যুতি নয়
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক সময়ের ইসরায়েল সফরকে ভারতের পশ্চিম এশিয়া নীতির বড় কোনো পরিবর্তন হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি ধারাবাহিকতার প্রতিফলন — কোনো বিচ্যুতি নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি বিকশিত হয়েছে, কিন্তু এর মূল নীতিগুলো অপরিবর্তিত রয়েছে: ভারসাম্য, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পৃক্ততা।ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন নয়ভারত ১৯৯২ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। তারপর থেকে সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তি ক্ষেত্রে। ইসরায়েল বহু বছর ধরে ভারতের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা সরবরাহকারী, এবং সন্ত্রাসবিরোধী ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী সহযোগিতা রয়েছে।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যা পরিবর্তন হয়েছে তা সম্পর্কের ভিত্তি নয়, বরং তার দৃশ্যমানতা। উচ্চপর্যায়ের সফর এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রকাশ্য স্বীকৃতি নতুন মনে হতে পারে, কিন্তু এই অংশীদারিত্ব বিভিন্ন সরকারের অধীনে কয়েক দশক ধরে গড়ে উঠেছে।ফিলিস্তিনকে পরিত্যাগ করা নয়কিছু সমালোচক মনে করেন, ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ভারতের ঐতিহ্যগত ফিলিস্তিন সমর্থন থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়।ভারত এখনো দুই-রাষ্ট্র সমাধানকে সমর্থন করে এবং ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারত ধারাবাহিকভাবে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বর্তমান নীতিতে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনকে পৃথক সম্পর্ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটির সঙ্গে সম্পৃক্ততা অন্যটির থেকে দূরে সরে যাওয়া বোঝায় না।এই ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি ভারতের জন্য ইসরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব করে, একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি অধিকারের বিষয়ে তার দীর্ঘদিনের অবস্থান বজায় রাখে।কৌশলগত ও বাস্তব কারণইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বাস্তব প্রয়োজন দ্বারা পরিচালিত:• প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ভারতের নিরাপত্তা সক্ষমতা শক্তিশালী করেছে।• প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব কৃষি, পানি সংরক্ষণ এবং উদ্ভাবনের মতো ক্ষেত্রে সহায়তা করছে।• সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা যৌথ নিরাপত্তা উদ্বেগকে প্রতিফলিত করে।এই সিদ্ধান্তগুলো মতাদর্শ নয়, বরং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে।বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়া কৌশলভারত পশ্চিম এশিয়া জুড়ে শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রেখেছে — ইসরায়েল, উপসাগরীয় দেশ এবং ইরানের সঙ্গে। জ্বালানি সরবরাহের জন্য ভারত উপসাগরীয় অঞ্চলের উপর নির্ভরশীল এবং সেখানে বৃহৎ ভারতীয় প্রবাসী সম্প্রদায় রয়েছে। একই সঙ্গে, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।এই বহুমুখী সম্পৃক্ততা দেখায় যে ভারত কোনো একক দেশের সঙ্গে একচেটিয়া জোটে আবদ্ধ হচ্ছে না। বরং, নিজের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে পুরো অঞ্চলে সম্পর্ক গড়ে তুলছে।গুরুত্বপূর্ণভাবে, আঞ্চলিক পরিস্থিতিও পরিবর্তিত হয়েছে। এখন বেশ কয়েকটি আরব দেশ প্রকাশ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে। এর ফলে অতীতের কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা কমেছে এবং ভারতের ভারসাম্যপূর্ণ নীতি বজায় রাখা আরও সহজ হয়েছে।বর্ধিত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ধারাবাহিকতাপ্রধানমন্ত্রীর ইসরায়েল সফর কয়েক দশকে পরিপক্ব হয়ে ওঠা একটি সম্পর্কের প্রতি আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন। এটি কোনো আকস্মিক পরিবর্তন বা ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুতি নয়। বরং এটি দেখায় যে ভারত একটি জটিল অঞ্চলে ভারসাম্য বজায় রেখে নিজের স্বার্থ খোলাখুলিভাবে এগিয়ে নিতে স্বচ্ছন্দ।সংক্ষেপে, এই সফর নীতির ধারাবাহিকতার প্রতিফলন — পশ্চিম এশিয়ার প্রতি একটি স্থির, বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি, যা কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। লেখক: সাংবাদিক