Pujo Story: দেবীর ইচ্ছেতেই কি বদলায় বিসর্জনের পথ? ৪৮০ বছরের নস্করি পুজোর অলৌকিক লোককথা
দেবীর হাতে অন্য শাঁখা উঠলেই ঘটে অঘটন। বিসর্জনে আজও বেছে নেওয়া হয় ভাঙাচোরা রাস্তা। প্রায় ৪৮০ বছরের পুরনো নস্করি দুর্গাপুজোর এমনই কিছু রহস্যময় লোককথা রয়েছে, যা শুনলে অবাক হওয়ার মতোই। বাংলাদেশের সীমান্তের কাছে এই পুজোকে ঘিরে রয়েছে স্বপ্নাদেশ, তন্ত্রসাধনা আর অলৌকিক অভিজ্ঞতার নানা কাহিনি।বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো মানেই নানা ইতিহাস, লোককথা আর অজানা কাহিনি। তেমনই এক ব্যতিক্রমী পুজো হল প্রায় ৪৮০ বছরের পুরনো নস্করি দুর্গাপুজো। বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেবীর স্বপ্নাদেশ, তন্ত্রসাধনা এবং এক শাঁখা বিক্রেতার অলৌকিক অভিজ্ঞতার কাহিনি।লোককথা অনুযায়ী, নস্কর বর্মন নামে এক ব্যক্তি স্বপ্নে মা দুর্গার দর্শন পান। এরপর এলাকার একটি নিমগাছের তলায় দেবীর পুজো শুরু করেন তিনি। সেই থেকেই দেবী পরিচিত হন ‘শ্রী শ্রী নস্করি দুর্গা মাতা’ বা ‘নস্করি মা’ নামে। একসময় তন্ত্রমতে এই পুজো হত।পুজোর সূচনা নিয়ে আরও একটি কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলের ভেড়ামারার মুরুটিয়ার এক জমিদার প্রতিমা নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে হুগলবেড়িয়ার একটি খালে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে আটকে পড়েন। দুর্গাপুজোর আর মাত্র দু'দিন বাকি। কথিত আছে, সেই সময় স্বপ্নে দেবী তাঁকে হুগলবেড়িয়াতেই পুজোর ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। এরপর নস্কর বাবা নামে এক সাধকের সাহায্যে শুরু হয় পুজো।নস্করি দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণ শাঁখা বিক্রেতার কাহিনি। প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, একদিন কুঠিঘাটে এক শাঁখা বিক্রেতার কাছে শাঁখা চান এক তরুণী। তাঁর সিঁথি সিঁদুরে ভরা থাকলেও হাতে শাঁখা ছিল না। শাঁখা নিয়ে দাম চাইলে তরুণী তাঁকে নস্করবাড়ি থেকে টাকা নিতে বলেন।কিন্তু নস্করবাড়িতে গিয়ে বিক্রেতা জানতে পারেন, ওই তরুণী সেখানে থাকেন না। পরে বাড়ির লোকজনের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে তিনি নাকি দেবী দুর্গার দর্শন পান। সেই থেকেই এই পুজোয় শাঁখার বিশেষ রীতি চালু রয়েছে বলে বিশ্বাস। আজও পাল শাঁখারি পরিবারের সদস্যরাই দেবীর জন্য শাঁখা নিয়ে আসেন। কথিত আছে, দেবী অন্য কারও আনা শাঁখা গ্রহণ করেন না।সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে পুজোর কিছু নিয়মেও পরিবর্তন এসেছে। আগে পশুবলি দেওয়া হত বলে কথিত রয়েছে। পরে সেই প্রথা বন্ধ করে চালকুমড়ো বলি দেওয়া শুরু হয়। সপ্তমীতে ভাত, অষ্টমীতে লুচি, নবমীতে খিচুড়ি এবং দশমীতে দই দিয়ে মাখানো খই নিবেদন করা হয় দেবীকে।এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সম্প্রীতির কাহিনিও। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এক হাজি সাহেব দেবীর জন্য মন্দির তৈরি করে দিয়েছিলেন। আজও বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ দেবীর আশীর্বাদ নিতে আসেন।নস্করি মায়ের বিসর্জনেও রয়েছে বিশেষ নিয়ম। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, প্রথমবার যে পথে দেবীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, বিসর্জনের সময়ও সেই পথই অনুসরণ করতে হয়। রাস্তা সহজ হলেও ধানখেত, গর্ত আর গরুর চলাচলের পথ দিয়েই ভক্তরা কাঁধে করে প্রতিমা নিয়ে যান ঘাটে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, নিয়মের অন্যথা হলে প্রতিমা এত ভারী হয়ে যায় যে তা তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।প্রায় ৪৮০ বছরের ইতিহাস, তন্ত্রসাধনার স্মৃতি, শাঁখা বিক্রেতার কাহিনি আর দুই দেশের মানুষের বিশ্বাস। সব মিলিয়ে নস্করি দুর্গাপুজো বাংলার বনেদি পুজোর ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। সময় বদলেছে, বদলেছে অনেক রীতি। কিন্তু নস্করি মাকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাস আর ঐতিহ্য আজও অটুট।