পর্দায় আজও অমলিন সেই চিরচেনা হাসি, জন্মশতবর্ষেও বাঙালির আবেগের শেষ ঠিকানা উত্তম
কলকাতা: শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও বাঙালির আবেগ, নস্টালজিয়া আর রোম্যান্টিকতার শেষ আশ্রয়স্থল তিনি। তাঁর হাসি, চলন-বলন আর চোখের চাউনি আজও কয়েক প্রজন্মের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে তোলে। মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষের ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আরও একবার স্মৃতির ঝাঁপি খুলল টলিউড। এই বিশেষ দিনে কিংবদন্তি অভিনেতাকে স্মরণ করতে গিয়ে কার্যত আবেগে ভাসলেন প্রবীণ অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। শৈশব থেকে মহানায়কের ছায়ায় বেড়ে ওঠার কথা মনে করিয়ে মাধবী মুখোপাধ্যায় অকপটে জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের চোখে উত্তম কুমার শারীরিক ভাবে মৃত হতে পারেন, কিন্তু তাঁর হৃদয়ে তিনি আজও সমান জীবন্ত। শিশির ভাদুড়ি, ছবি বিশ্বাস কিংবা কমল মিত্রদের মতো মহারথীদের সঙ্গে অভিনয় করার অভিজ্ঞতা থাকলেও উত্তমের মানবিকতা তাঁকে সব সময় আলাদা করে রাখত। কেবল নিজের সাফল্য নয়, চলচ্চিত্র জগতের পিছিয়ে পড়া টেকনিশিয়ান ও সহশিল্পীদের পাশে দাঁড়াতে নিজের উদ্যোগে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘শিল্পী সংসদ’। মাধবীর মতে, সেই সংগঠনের মাধ্যমে দুঃস্থ শিল্পীদের জন্য যে দায়িত্ববোধ তিনি রেখে গিয়েছেন, তাতেই তিনি চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।একই সুর ধরা পড়েছে প্রবীণ অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণাতেও। বৃষ্টিভেজা দিনে পুরনো দিনের কথা মনে করতে গিয়ে মনভারাক্রান্ত সাবিত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, উত্তম কুমার নেই এটা তিনি মন থেকে মানতেই পারেন না। তাঁর সাফ কথা, টিভির পর্দায় একটা ছবি চালিয়ে বসলেই যখন মানুষটা চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠেন, তখন আলাদা করে স্মৃতি হাতড়ানোর কোনো মানেই হয় না। ‘বসু পরিবার’, ‘রাইকমল’, ‘মরুতীর্থ হিঙ্গলাজ’ কিংবা ‘নিশিপদ্ম’— বহু কালজয়ী ছবির নায়িকা সাবিত্রী অকপটে স্বীকার করেন, তাঁর নিজের হয়তো তথাকথিত গ্ল্যামার বা রূপ ছিল না, কিন্তু অভিনয়ের শক্তিতেই তিনি কাজ করে গিয়েছেন এবং সেই যাত্রায় উত্তম কুমারের অকৃপণ সহযোগিতা পেয়েছেন। পর্দার বাইরেও মহানায়কের পরিবারের সঙ্গে সাবিত্রীর ছিল গভীর আত্মীয়তা। তাঁকে লোকে ‘মহানায়ক’ বা ‘মহা হিরো’ কী বলল তাতে কিছু যায়-আসে না, শিল্পী ও মানুষ হিসেবে তাঁর কোনো বিকল্প ছিল না বলেই আজও বিশ্বাস করেন তিনি।অন্যদিকে অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, উত্তম কুমার কোনওদিনই বাঙালির কাছে ‘অতীত’ নন, তিনি বাঙালির রক্তে মেশা নিত্যদিনের ‘বর্তমান’। কোনও বাঙালি কখনই ‘উত্তম কুমার ছিলেন’ এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন না। তিনি যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রতিটি বাঙালি পরিবারের অলিখিত সদস্য। কারও প্রথম প্রেমের মুখ, আবার কারও শৈশবের রবিবারের দুপুর। প্রসেনজিৎ মনে করিয়ে দেন, সিনেমার ভাষা বা নায়কের সংজ্ঞা যতই বদলাক না কেন, প্রেম, একাকিত্ব, অহংকার কিংবা ব্যর্থতার মতো চিরন্তন অনুভূতিগুলোকে অভিনয়ের জাদুতে জীবন্ত করে তোলার দক্ষতায় উত্তম কুমারের কোনো তুলনা নেই। নিজের স্টারডমকে অবলীলায় সরিয়ে রেখে যিনি চরিত্রের রক্তমাংস ফুটিয়ে তুলতে পারতেন, তাঁর কাছে বাঙালির ফিরে আসাটা নিছক স্মৃতি নয়, বরং জাতির মজ্জাগত এক অভ্যাস। তিন প্রজন্মের এই আবেগঘন শ্রদ্ধার্ঘ্যে শতবর্ষের আঙিনায় দাঁড়িয়েও দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত হল, উত্তম কুমার আসলে কালের সীমানা অতিক্রম করা এক অমর অনুভূতি।[TECHTARANGA-POST:12245]হিডেন স্টোরিজ নিউজ