বিষাদের মহাপ্রস্থান: নিজের কথা সত্যি করেই চলে গেলেন অনীক! টলিপাড়ার উপেক্ষাই কি কাড়ল প্রাণ?
কলকাতা: টলিউডের এক চরম দুর্দিনের সাক্ষী থাকল বুধবারের তপ্ত দুপুর। ঢাকুরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে ভেসে আসা একটি আকস্মিক খবর স্তব্ধ করে দিল গোটা চলচ্চিত্র মহলকে। জানা যায়, গড়িয়াহাটের নিজ বাসভবনের চারতলার ছাদ থেকে নীচে পড়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকার পর শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর পরিচালক অনীক দত্ত। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই আবালবৃদ্ধবনিতা ও সিনেমা অনুরাগীদের হৃদয়ে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। বাঙালিকে আজীবন হাসানো এবং ভাবানো মানুষটি যে এভাবে চিরতরে সিনে-ফ্রেমের বাইরে চলে যাবেন, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।[TECHTARANGA-POST:9527]বিজ্ঞাপনের রঙিন দুনিয়ার সফল কেরিয়ার ছেড়ে বাংলা সিনেমার চিরাচরিত ধারা বদলে দিতে এসেছিলেন ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা নরেন্দ্রচন্দ্র দত্তের পৌত্র অনীক দত্ত। মাত্র ৬২ বছর বয়সে, আটটি কালজয়ী সৃষ্টি সম্বল করেই বিদায় নিলেন এই প্রাজ্ঞ পরিচালক। তবে, তাঁর এই রহস্যজনক চলে যাওয়ার সমান্তরালে এক বেদনাদায়ক সমাপতন এখন তাড়া করে বেড়াচ্ছে আপামর বাঙালিকে।[TECHTARANGA-POST:9508]সেটা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কথা। তখন পরিচালকের সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ মুক্তির প্রহর গুনছিল। ঠিক সেই সময় ইন্ডাস্ট্রির অভ্যন্তরীণ দলাদলি, নোংরা রাজনীতি এবং অভিনেতা আবির চট্টোপাধ্যায়ের অসহযোগিতা নিয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে তীব্র ক্ষোভ ও অভিমান উগরে দিয়েছিলেন তিনি। একাধিক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে বলেছিলেন, “শারীরিক অসুস্থতার কারণে সেটে উপস্থিত থাকতে না পারা অত্যন্ত পীড়াদায়ক। শরীর যেভাবে ভেঙে পড়ছে, তাতে আর নতুন কোনও চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। এটাই সম্ভবত আমার জীবনের শেষ ছবি।” তখন নেটিজেন বা সহকর্মীরা বিষয়টিকে সাময়িক ক্লান্তি বা অভিমানের বহিঃপ্রকাশ বলে ধরে নিলেও, আজ প্রমাণিত হল যে অলক্ষ্যে এক অমোঘ ভবিষ্যৎবাণীই করেছিলেন তিনি![TECHTARANGA-POST:9541]মুম্বইয়ের বিজ্ঞাপনী জগতের বিপুল অর্থ ও গরিমা ত্যাগ করে শুধুমাত্র ভালো বাংলা ছবি বানানোর তাগিদে কলকাতায় পা রেখেছিলেন অনীক। কিন্তু, বিনিময়ে টলিপাড়ার একাংশের কাছ থেকে বঞ্চনা, অসহযোগিতা এবং নোংরা রাজনীতির শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে। ইন্ডাস্ট্রির অভ্যন্তরীণ এই নোংরা দলাদলি তাঁকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিল। আজ সিনেমহলে এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে — টলিউডের কিছু প্রভাবশালী মানুষের ঔদ্ধত্য আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতেই কি শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত হয়ে নিজেকে সরিয়ে নিলেন এই স্পষ্টবক্তা পরিচালক?[TECHTARANGA-POST:9444]২০১২ সালে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবির মাধ্যমে যে রূপকথা শুরু হয়েছিল, তা ‘আশ্চর্য প্রদীপ’, ‘মেঘনাদবধ রহস্য’, ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ হয়ে সত্যজিৎ রায়কে শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি ‘অপরাজিত’ ছবিতে সাফল্যের শিখর স্পর্শ করেছিল। তীক্ষ্ণ সামাজিক কৌতুক আর বুদ্ধিদীপ্ত রাজনৈতিক ব্যঙ্গই ছিল তাঁর কাজের মূল দর্পণ। আজ সেই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরটিই নীরব হয়ে গেল! যার প্রকৃত কারণ আপাতত তদন্তের বেড়াজালে আবদ্ধ। রাজপথে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা এক অভিভাবককে হারিয়ে আজ টলিপাড়াও অভিভাবকহীন। ভালো থাকবেন পরিচালক, আপনার রেখে যাওয়া ‘ভবিষ্যৎ’ চিরকাল বাঙালির মননে অমলিন থাকবে!