কালীঘাটে সিআইডির হানা! মমতার ডেরায় ধুন্ধুমার, শেষ ডেডলাইনের আগে পার্টি অফিস ঘিরল কেন্দ্রীয় বাহিনী
কলকাতা: রাজ্য রাজনীতি কাঁপানো সেই হাইপ্রোফাইল ‘সই জাল’ কাণ্ডে এবার সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাসভবন সংলগ্ন তৃণমূলের মূল দুর্গে হানা দিল সিআইডি। মঙ্গলবার দুপুরে ঘড়ির কাঁটায় ঠিক ৩টে ১৫ মিনিট নাগাদ ৩০ বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে অবস্থিত তৃণমূলের সেন্ট্রাল পার্টি অফিসে আচমকাই হাজির হন সিআইডি গোয়েন্দাদের একটি বিশেষ টিম। সিআইডির মহিলা আধিকারিকরা মুহূর্তের মধ্যে কার্যালয়ের মূল গেট ঘিরে ফেলেন এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় কলকাতা পুলিশের বিশাল বাহিনী ও কেন্দ্রীয় জওয়ানরা। সই জালিয়াতির তদন্তে খোদ সুপ্রিমোর পার্টি অফিসে গোয়েন্দাদের এই নজিরবিহীন প্রবেশ ঘিরে এই মুহূর্তে কালীঘাটে চরম উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:9828]সিআইডি সূত্রে জানা গিয়েছে, এই তল্লাশি অভিযানের সূত্রপাত খোদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া একটি চিঠির বয়ানকে কেন্দ্র করে। সই জাল কাণ্ডে সিআইডির নোটিসের জবাবে অভিষেক লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন যে, বিধানসভায় জমা দেওয়া বিধায়কদের বিতর্কিত সইগুলি আসলে ৩০ বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের এই সেন্ট্রাল পার্টি অফিসেই সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই আজ ওই কার্যালয়ের ভেতরের ‘লগবুক’ এবং সই সংগ্রহের আসল নথি উদ্ধার করতে মরিয়া হয়ে পৌঁছায় সিআইডি। তবে এই মুহূর্তে মমতা ও অভিষেক দুজনেই রাজনৈতিক কারণে দিল্লিতে রয়েছেন। ফলে কার্যালয়ের দায়িত্বে থাকা দলের কোষাধ্যক্ষ তথা প্রবীণ আইনজীবী শুভাশিষ চক্রবর্তী সিআইডির পথ আটকে দাঁড়ান। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, দলনেত্রী ও অভিষেক না থাকায় এবং আগাম নোটিস ছাড়া তিনি কোনওভাবেই কার্যালয়ের ভেতরে তল্লাশির অনুমতি দেবেন না।[TECHTARANGA-POST:9827]আইনজীবী শুভাশিষ চক্রবর্তী সিআইডি আধিকারিকদের উদ্দেশে স্পষ্ট বলেন, “আমি একজন আইনজীবী, আপনারা আমাকে না জানিয়ে হুট করে এসেছেন। যাঁদের বয়ানের ভিত্তিতে এসেছেন, তাঁরা কেউ এখন এখানে নেই। ওনারা ফিরুন, আপনারা দু’দিন পর আসুন।” এর পরেই মেজাজ হারান গোয়েন্দারা। সিআইডির পক্ষ থেকে পালটা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, “আপনি সরকারি কাজে বাধা দিচ্ছেন, এর পরিণতি কী হতে পারে তা আপনার ভালো করেই জানা উচিত।” এই নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে তীব্র কথা কাটাকাটি ও বাদানুবাদ শুরু হলে শুভাশিষবাবু সাফ জানান, “আমার যা বলার বললাম, এবার আপনারা কী করবেন সেটা আপনাদের ব্যাপার” এই বলে তিনি ভেতরে চলে যান। এর পরেই ক্ষুব্ধ সিআইডি আধিকারিকরা বাইরে এসে নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেন এবং পুরো কার্যালয়টি কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে কর্ডন করে ফেলা হয়। অন্যদিকে, ঠিক একই সময়ে ক্যামাক স্ট্রিটে অবস্থিত অভিষেকের অফিসেও পৌঁছে যায় সিআইডির আরেকটি বড় প্রতিনিধি দল।[TECHTARANGA-POST:9828]এই গোটা তুলকালাম কাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে গত মে মাসের এক বিরাট জালিয়াতির অভিযোগ, যার জেরে ইতিমধ্যেই তৃণমূল দলটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে। গত ৬ মে কালীঘাটের বৈঠকে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার প্রস্তাব পাশ হলেও, ১৯ মে গরহাজির বিধায়কদের সই সংগ্রহ নিয়ে ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। বিধানসভার সচিবের কাছে তৃণমূলের জমা দেওয়া ৭০ জন বিধায়কের সইয়ের সঙ্গে তাঁদের শপথগ্রহণের সইয়ের আকাশ-পাতাল অমিল মেলায় সচিব খোদ থানায় এফআইআর দায়ের করেন, যার তদন্তভার পায় সিআইডি। এই মামলায় ইতিমধ্যেই একাধিক বিধায়ককে জেরা করা হয়েছে এবং দলের ‘সেনাপতি’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনবার সমন পাঠানো হলেও তিনি বারবার সময় চেয়ে এড়ানোর চেষ্টা করেছেন। সিআইডির শেষ আলটিমেটাম অনুযায়ী আজ মঙ্গলবার বিকেল ঠিক ৫টায় শেষ হচ্ছে অভিষেকের ডেডলাইন। আর সেই সময়সীমা পার হওয়ার ঠিক পৌনে দু’ঘণ্টা আগে কালীঘাটে সিআইডির এই হানা এবং ৩টি জায়গায় যুগপৎ অপারেশন শাসকদলের কপালে চিন্তার ভাঁজ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।