কলকাতা: বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে বুধবারের দুপুরটি এক চরম ঐতিহাসিক এবং নজিরবিহীন পটপরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে রইল। একদিকে যখন বিধানসভার অন্দরে বিপুল বিধায়ক নিয়ে সরকারিভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল তৃণমূলের পরিষদীয় দল, ঠিক তার পাল্টা চাল হিসেবে এক মারাত্মক ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিল কালীঘাট। দলের অন্দরে ধেয়ে আসা এই শতাব্দীর সবথেকে বড় বিদ্রোহের লাভা সামাল দিতে বুধবার দুপুরে এক লহমায় পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত দলীয় কমিটি ভেঙে দিল তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। বুথ স্তর থেকে শুরু করে রাজ্য স্তর— তৃণমূলের ছাত্র, যুব, শ্রমিক ও মহিলা উইং-সহ সমস্ত সাংগঠনিক কমিটি এক বিজ্ঞপ্তিতে বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনে দলের শোচনীয় পরাজয় এবং তার পরপরই খোদ দলের অন্দরে তৈরি হওয়া এই ভয়াবহ ভাঙন রুখতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মরিয়া ও কৌশলী পদক্ষেপ কি না, তা নিয়ে এখন তোলপাড় গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক মহল।[TECHTARANGA-POST:9719]কালীঘাটের এই নজিরবিহীন পদক্ষেপের ঠিক আগেই বুধবার সকালে বিধানসভার অন্দরে এক চরম শক্তিশালীন চাল চালেন সদ্য বহিষ্কৃত হেভিওয়েট নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। দলত্যাগ বিরোধী আইনকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে খোদ তৃণমূলের ৫৮ জন বিধায়কের সই সংবলিত একটি অতি সংবেদনশীল চিঠি তিনি জমা দেন বিধানসভার স্পিকার বা অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসুর কাছে। ওই চিঠিতে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, বিধানসভায় তৃণমূলের প্রকৃত পরিষদীয় নেতা বা বিরোধী দলনেতা হচ্ছেন স্বয়ং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পাশাপাশি উপদলনেতা হিসেবে আরও তিন হেভিওয়েট মুখ— সন্দীপন সাহা, জাভেদ খান এবং শিউলি সাহার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে চিফ হুইপ বা মুখ্য সচেতক হিসেবে নাম রাখা হয়েছে রঘুনাথগঞ্জের বিধায়ক আখরুজ্জামানের। বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসু বিদ্রোহীদের এই চিঠিটি গ্রহণও করেছেন। তবে সবথেকে বড় রাজনৈতিক ম্যাজিক হলো, এই বিদ্রোহী বিধায়করা কিন্তু মমতার নেতৃত্বকে অস্বীকার করেননি; চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই দলের সর্বোচ্চ সভানেত্রী হিসেবে উল্লেখ করে তাঁরা দাবি করেছেন— তাঁরাই আসলে প্রকৃত এবং আসল ‘তৃণমূল ব্লক’।[TECHTARANGA-POST:9718]রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিধানসভায় এই ৫৮ বনাম ২২-এর পাটিগণিতে যখন কোণঠাসা আদি তৃণমূল শিবির, তখনই বিদ্রোহীদের সাংগঠনিক শক্তি এক লহমায় গুঁড়িয়ে দিতেই এই মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কারণ, বুধবার দুপুর পর্যন্তও দলের অত্যন্ত প্রভাবশালী শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসি (INTTUC)-র রাজ্য সভাপতি পদে বহাল তবিয়তে ছিলেন এই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু তাই নয়, তাঁর এই ‘বিদ্রোহী’ গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ বহু নেতাই রাজ্যের বিভিন্ন জেলার ব্লক বা জেলা স্তরের সংগঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সব পদ আঁকড়ে বসেছিলেন। ফলে একযোগে সমস্ত কমিটি ভেঙে দিয়ে ঋতব্রত-সহ সমস্ত বিক্ষুব্ধ বিধায়ক ও তাঁদের অনুগামীদের একঝটকায় সমস্ত সাংগঠনিক দায়িত্ব ও পদ থেকে ছেঁটে ফেলল তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব।[TECHTARANGA-POST:9717]বুধবার দুপুরে তৃণমূলের অফিশিয়াল সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে জানানো হয়, সব কিছু অত্যন্ত যত্ন সহকারে বিচার-বিবেচনা করার পরেই পশ্চিমবঙ্গে দলের সমস্ত কমিটি ভেঙে ফেলার এই চরম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই পোস্টে আরও দাবি করা হয়েছে, সংগঠনের প্রতিটি স্তরে এবার দল গভীর ও নিবিড় পর্যালোচনা এবং নতুন করে মূল্যায়ন করবে; তার ভিত্তিতেই খুব শীঘ্রই সম্পূর্ণ নতুন সাংগঠনিক কাঠামো সাজিয়ে পরবর্তী প্রক্রিয়া জানানো হবে। তবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যায়নের গল্পটা আসলে স্রেফ একটা বাহানা। মূলত দলের রাশ পুরোপুরি হাতছাড়া হওয়া আটকাতেই এই জরুরি অবস্থা জারির মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নেত্রী। এখন সব কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার পর জেলাস্তরের লক্ষ লক্ষ কর্মী কোন শিবিরের দিকে পা বাড়ান এবং কার হাতে শেষ পর্যন্ত জোড়াফুলের আসল রাশ থাকে, তা নিয়ে জল্পনা এখন এক্কেবারে আকাশছোঁয়া।
প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার