ওয়াশিংটন: আটলান্টিকের ওপারে মার্কিন অন্তর্বর্তী নির্বাচনে বড়সড় ধাক্কা খেল রিপাবলিকান শিবির। দেশের সাধারণ রাজনীতি ও ট্রাম্প প্রশাসনের বহু সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখান করে মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি সভা (হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস) এবং সেনেট, উভয় কক্ষেই জয়জয়কার ডেমোক্র্যাটিক পার্টির। ফলে মার্কিন আইনসভা বা কংগ্রেসের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য আগামী দিনগুলি অত্যন্ত কঠিন হতে চলেছে।
তবে হোয়াইট হাউস হাতছাড়া হলেও ক্ষমতার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্টের ‘ভিটো’ (Veto) ক্ষমতা প্রয়োগের সরাসরি হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। সামাজিক মাধ্যমে এক শব্দে ‘VETO’ পোস্ট করে প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ডেমোক্র্যাটদের আনা কোনও বিলই তিনি সহজে ছাড়বেন না।
‘মিস্টার ভিটো’ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতা
ভোটাভুটির ঠিক আগেই সংবাদসংস্থা সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তাঁর কিছু যায় আসে না। কারণ তাঁর হাতে রয়েছে সংবিধানের দেওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ‘ভিটো’ ক্ষমতা।
সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময়ে নিজেকে হাস্যরসে ‘মিস্টার ভিটো’ হিসেবে উল্লেখ করে ট্রাম্প জানান, ডেমোক্র্যাটদের পাস করানো আইন আটকাতে তিনি একের পর এক ভিটো প্রয়োগ করতে প্রস্তুত।
মার্কিন সংবিধানের ১ নম্বর অনুচ্ছেদের ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো বিল সেনেট ও প্রতিনিধি সভা উভয় কক্ষে পাস হওয়ার পর প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের জন্য হোয়াইট হাউসে পাঠানো হয়। প্রেসিডেন্ট চাইলে তাতে স্বাক্ষর করে আইনে পরিণত করতে পারেন, অথবা আপত্তি জানিয়ে তা বাতিল করে আবার কংগ্রেসে ফেরত পাঠাতে পারেন।
এই ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট পুরো আইন প্রক্রিয়াটিকেই অচল করে দিতে পারেন। প্রেসিডেন্ট চাইলে আগামী ১০ দিনের মধ্যে কোনো বিলে সই না করে বা তা ফেরত না দিয়ে ‘পকেট ভিটো’ (Pocket Veto)-র মাধ্যমেও বিলটি অকার্যকর করে দিতে পারেন।

ক্যাপিটল হিল বনাম হোয়াইট হাউস: ভিটো বাতিলের জটিল পথ
ট্রাম্পের এই ভিটো ক্ষমতার হুংকারের মুখে ডেমোক্র্যাটরা কি একেবারেই অসহায়? মার্কিন সংবিধানের নিয়ম কিন্তু তা বলছে না। আইনসভা চাইলে প্রেসিডেন্টের ভিটো ক্ষমতা খারিজ বা বাতিল (Override) করতে পারে। কিন্তু সেই পথ অত্যন্ত কঠিন ও জটিল।
কোনও বিতার্কিত বিলে প্রেসিডেন্টের ভিটো বাতিল করতে হলে ৪৩৫ আসন বিশিষ্ট হাউসে অন্তত ২৯০ জনের সমর্থন এবং ১০০ সদস্যের সেনেটে অন্তত ৬৭ জন সদস্যের ভোটের প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ, দুটি কক্ষেই পৃথকভাবে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ (Two-Thirds Majority) সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের দলের বাইরে গিয়ে বেশ কিছু রিপাবলিকান সদস্যের সমর্থন আদায় করতে হবে, যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষা। মার্কিন ইতিহাসের নথিপত্র খতিয়ে দেখলে দেখা যায়, এ যাবৎকালে প্রেসিডেন্টের দেওয়া ভিটো আইনসভা দ্বারা বাতিল হওয়ার ঘটনা একেবারেই বিরল।
দর কষাকষির রাজনীতি ও সুপ্রিম কোর্টের রায়ের হাতিয়ার
প্রবীণ মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভিটো শুধু কোনো প্রস্তাবিত বিল বাতিল করার মাধ্যম নয়, বরং আইনসভার সঙ্গে দর কষাকষির ক্ষেত্রে এটি রাষ্ট্রপতির অন্যতম প্রধান মানসিক অস্ত্র। ট্রাম্পের নিজের ভাষ্যমতে, “ঐতিহাসিকভাবেই প্রেসিডেন্ট কয়েক মাস ভিটো প্রয়োগ করার পর ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের উদ্যোগেই এসে বলে যে, চলুন আমরা সমঝোতা বা চুক্তি করি।”
এর পাশাপাশি ফক্স নিউজ ও অন্যান্য সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প অতি সম্প্রতি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ‘ট্রাম্প বনাম স্লটার’ (Trump v. Slaughter) সংক্রান্ত রায়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের সেই রায় উল্লেখ করে ট্রাম্পের দাবি, ফেডারেল এজেন্সি ও স্বাধীন কমিশনগুলির ওপর প্রেসিডেন্টের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সব মিলিয়ে, আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে ক্যাপিটল হিল ডেমোক্র্যাটদের দখলে গেলেও, সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হতে চলেছে প্রেসিডেন্টের ভিটো এবং তার পাল্টা রাজনৈতিক চাল। আইনসভার পাস করানো বিলে ট্রাম্পের ভিটো এবং ডেমোক্র্যাটদের পাল্টা প্রতিরোধে ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ মেয়াদী অচলবস্থা ও টানাপোড়েনের ইঙ্গিত কিন্তু স্পষ্ট।
Leave a comment