কলকাতা: কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও শিল্পায়নকে একশো শতাংশ গতিশীল করতে বৃহস্পতিবার রাজ্যবাসীর সামনে ঐতিহাসিক নতুন শিল্পনীতি ঘোষণা করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। রাজ্যে পালাবদলের পর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই কর্মসংস্থানের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী, তা বাস্তবায়িত করতেই এদিন একগুচ্ছ মেগা ইনসেন্টিভ বা আর্থিক সহায়তার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ শুল্ক থেকে জমির স্ট্যাম্প ডিউটি, সবেতেই বড়সড় ছাড়ের পাশাপাশি নারী ও রূপান্তরকামীদের কর্মসংস্থানে ইপিএফ (EPF) বাবদ পুরো অর্থই দেওয়ার কথা জানিয়েছে রাজ্য। তবে সমস্ত লগ্নিকারীকে লাল carpet বিছিয়ে স্বাগত জানালেও শিল্পমহলের সামনে দুর্নীতি ও তোলাবাজির প্রশ্নে কড়া সীমারেখা টেনে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
শিল্পে লগ্নিকারীদের জন্য বিরাট উপহার ও ইপিএফ ছাড়
বৃহস্পতিবার নয়া শিল্পনীতি ঘোষণার অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, রাজ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া এলাকার রুগ্ন ও বন্ধ ইউনিটগুলিকে চাঙ্গা করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) ক্ষেত্রকে চাঙ্গা করতে বড় ঘোষণা করেছে রাজ্য।
আরও পড়ুন: ফেলে রাখা যাবে না জমি, শিল্পনীতি ঘোষণার আগে কড়া বার্তা নবান্নর
এই ক্ষেত্রে মহিলা ও রূপান্তরকামী কর্মীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে সংস্থার ভাগের সম্পূর্ণ ইপিএফ (EPF) অনুদান আগামী ১০ বছর পর্যন্ত দেবে রাজ্য সরকার। পুরুষ কর্মীদের ক্ষেত্রে এই সহায়তার পরিমাণ হবে ৫০ শতাংশ। এছাড়া যে সমস্ত শিল্প ইউনিটে ২০০-র বেশি কর্মী রয়েছেন, সেখানকার মহিলা কর্মীদের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তার অংশের ৭৫ শতাংশ বহন করবে রাজ্য।
বৃহৎ ইউনিট ও মেগা প্রকল্পের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত এলাকায় অন্তত ২০০ জন এবং অন্যান্য অঞ্চলে অন্তত ৪০০ জন কর্মী থাকলে, ৫ বছর পর্যন্ত নিয়োগকর্তার ৫০ শতাংশ ইপিএফের দায়িত্ব নেবে সরকার। পাশাপাশি, পুরনো শিল্প ইউনিটের সম্প্রসারণ, প্ল্যান্ট ও যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণ ইউনিটের জন্য ১০০ শতাংশ সহায়তার সীমা রাখা হয়েছে, যা থ্রাস্ট সেক্টর বা অগ্রাধিকারের এলাকায় যথাক্রমে ১১০ থেকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তবে এই সহায়তা মিলবে উৎপাদন শুরুর পর ধাপে ধাপে।
বিদ্যুৎ খরচ ও পরিকাঠামোর ক্ষেত্রেও বড় স্বস্তি দিয়েছে সরকার। আগামী ৫ বছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ মাশুল এবং জমির স্ট্যাম্প ডিউটিতে বিশেষ ছাড় মিলবে। এমনকি পুনর্নবীকরণযোগ্য বিদ্যুতের ওপেন অ্যাক্সেসে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত সারচার্জ মকুব করা হয়েছে। তবে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানানো হয়েছে, জমি বরাদ্দের পর তিন মাসের মধ্যে কোনও কাজ শুরু না করলে সেই জমি ফিরিয়ে নেবে রাজ্য।
দুর্নীতিগ্রস্ত ও আর্থিক অপরাধীদের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক নয়: স্পষ্ট বার্তা
বিনিয়োগের আমন্ত্রণের পাশাপাশি শিল্পপতিদের সামনে কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে সিবিআই বা ইডি-র মামলা রয়েছে কিংবা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের টাকা আত্মসাৎ ও আর্থিক জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তাঁদের সঙ্গে কোনও রকম ‘ওয়ার্কিং রিলেশন’ বা কাজের সম্পর্ক রাখা সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত সৌজন্যের খাতিরে দেখা হলে নমস্কার বা হ্যালো বিনিময় হলেও প্রশাসনিক স্তরে দুর্নীতিগ্রস্তদের সঙ্গে কোনও আপস করা হবে না বলেই সাফ জানিয়েছেন তিনি।
‘তোলাবাজি রুখতে ১৫ মিনিটে গ্রেফতার’, কড়া নজরদারি টোল প্লাজায়
শিল্পের অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে কঠোর হাতে দমন করা হবে, এদিন তাও স্পষ্ট করে দেন মুখ্যমন্ত্রী। শিল্পপতিদের উদ্দেশে তাঁর কড়া বার্তা, রাজ্যে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে বিন্দুমাত্র উদ্বেগের কারণ নেই। তোলাবাজি বা ব্যবসায়িক কার্যকলাপে কেউ বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করলে অভিযোগ পাওয়ার মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে কড়া আইনি পদক্ষেপ ও গ্রেফতারি করা হবে।
পরিবহণ ও বাণিজ্যের পথ মসৃণ করতে রাজ্যজুড়ে টোল প্লাজাগুলিতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ডানকুনি ও দুর্গাপুরের টোল প্লাজায় বেআইনি তোলা আদায় বন্ধ করার কথা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে সল্টলেকের কন্ট্রোল রুম থেকে গোটা রাজ্যের সমস্ত টোল প্লাজার ওপর কড়া নজরদারি রাখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, একদিকে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা এবং অন্যদিকে কঠোর প্রশাসনিক নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার বার্তা দিয়ে বাংলার শিল্প মানচিত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করল রাজ্য সরকার।
Leave a comment