লিসবন: ফুটবল বিশ্বকে এক অদ্ভুত শূন্যতায় ডুবিয়ে দীর্ঘ ২৩ বছরের বর্ণময় আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে ইতি টানলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো (Cristiano Ronaldo Retirement)। পর্তুগালের জার্সিতে আর কখনও মাঠে নামবেন না পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই বিশ্ববিখ্যাত মহাতারকা।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বাধিক গোল এবং সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার অমর সব নজির নিজের নামের পাশে খোদাই করে শেষমেশ বুটজোড়া তুলে রাখলেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ফুটবল জাদুকর।
সোশাল মিডিয়ায় একটি আবেগঘন ভিডিও পোস্ট করে নিজের অবসরের সিদ্ধান্ত নিজেই ঘোষণা করেছেন সিআর সেভেন। পর্তুগিজ ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে ফেলা রোনাল্ডো তাঁর বিদায়ী বার্তায় অত্যন্ত ব্যথিত ও কৃতজ্ঞ গলায় জানান, “পর্তুগালের মানুষকে জানাতে চাই, জাতীয় দলের সাত নম্বর জার্সি তুলে রাখার সময় অবশেষে এসে গিয়েছে। দীর্ঘ তেইশটা বছর ধরে এই পবিত্র জার্সি গায়ে চাপানোর দুর্লভ সৌভাগ্য আমার হয়েছে।”
তিনি আরও স্পষ্ট করে দেন যে, আসন্ন নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতির পর থেকে আর কখনোই পর্তুগালের জার্সিতে দেখা যাবে না তাঁকে। দেশের সাত নম্বর জার্সি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় দলের হাতে ফিরিয়ে দিচ্ছেন।
রেকর্ড ভাঙা ২৩ বছরের রাজপথ
২০০৩ সালের আগস্ট মাসে কাজাখস্তানের বিরুদ্ধে ম্যাচে প্রথম পর্তুগালের সিনিয়র দলের জার্সিতে অভিষেক ঘটেছিল তরুণ ক্রিশ্চিয়ানোর। তারপর থেকেই শুরু হয় এক রূপকথার পথচলা। ৪১ বছর বয়সি এই পর্তুগিজ অধিনায়ক আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার হিসেবে বুটজোড়া তুলছেন। পর্তুগালের হয়ে মোট ২৩৪টি ম্যাচে মাঠে নেমে তাঁর নামের পাশে জমা হয়েছে রেকর্ড ১৪৬টি গোল।
দেশের জার্সিতে কেরিয়ারে একাধিক ঐতিহাসিক সাফল্যের রূপকার ছিলেন তিনি। ২০১৬ সালে ফ্রান্সকে তাদেরই মাটিতে হারিয়ে পর্তুগালের ইতিহাসের প্রথম ইউরো কাপ জয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রোনাল্ডো। এরপর ২০১৮-১৯ এবং পরবর্তীতে ২০২৪-২৫ মরশুমে উয়েফা নেশনস লিগের ট্রফিও উঁচিয়ে ধরে পর্তুগিজ ফুটবলকে এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেন তিনি।
গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পর্তুগালের জাতীয় দলের সাফল্য, গৌরব এবং লড়াইয়ের সমার্থক হয়ে উঠেছিল সিআর সেভেনের নাম। তবে এত অর্জনের ভিড়েও ফুটবলবিশ্বের সর্বকালের সেরা এই তারকার মুকুটে একমাত্র আক্ষেপ হয়ে থেকে গেল বিশ্বকাপ জয়ের অধরা স্বপ্ন।

শেষ পর্বের বিতর্ক ও কোচের সঙ্গে সংঘাত
যদিও বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের শেষ অধ্যায়টি খুব একটা মসৃণ বা স্বস্তিদায়ক ছিল না। গত অক্টোবরেই জাতীয় দলের কোচ জর্জে জেসুসের সঙ্গে মারাত্মক এক মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলেন রোনাল্ডো। নরওয়ের বিরুদ্ধে নেশনস লিগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে কোচ তাঁকে প্রথম একাদশে তো বটেই, শেষ পর্যন্ত মাঠেই নামাননি।
সাইডলাইনে ওয়ার্মআপ করানোর পরও তাঁকে মাঠে না নামানোর সিদ্ধান্ত তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। পরবর্তীসময়ে ডেনমার্কের বিরুদ্ধে ম্যাচেও তাঁকে রিজার্ভ বেঞ্চে বসিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে। আকস্মিকভাবে শিবির ছেড়ে বেরিয়ে যান ক্রিশ্চিয়ানো, যা নিয়ে বিশ্ব ফুটবলমহলে শুরু হয় তুমুল আলোড়ন।
এই ঘটনার জেরে পর্তুগালের ফুটবল সংস্থা কড়া পদক্ষেপ করে তাঁকে ৩০ দিনের জন্য নির্বাসিত করে। যদিও সেই শাস্তি মাথা পেতে নিয়েছিলেন রোনাল্ডো এবং সতীর্থ ও সমর্থকদের কাছে নিজের আচরণের জন্য ক্ষমাও চেয়ে নিয়েছিলেন।
কোচ জর্জে জেসুস পরে দুই পক্ষের মধ্যে কোনও বড় সংঘাতের কথা অস্বীকার করে দল নির্বাচন একান্তই তাঁর নিজের দায়িত্ব বলে পরিষ্কার করে দিলেও, রোনাল্ডোর হঠাৎ শিবির ছাড়ার ঘটনা তাঁর আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে চিরতরে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্তই নিলেন মহাতারকা।
ক্লাব ফুটবলে অভিযান ও হাজারের হাতছানি
আন্তর্জাতিক অধ্যায় শেষ হলেও এখনই বুটজোড়া চিরতরে তুলে রাখছেন না রোনাল্ডো। ক্লাব ফুটবলে এশিয়া তথা সৌদির ক্লাব আল নাসরের জার্সিতে এখনও দারুণ ছন্দে দাপিয়ে খেলছেন তিনি। ক্লাব ফুটবলের সমেত তাঁর কেরিয়ারের মোট গোলসংখ্যা ইতিমধ্যে পৌঁছে গিয়েছে ৯৮৫টিতে।
অর্থাৎ, বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এক হাজার (১০০০) গোলের অবিশ্বাস্য ও ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁতে থেকে আর মাত্র ১৫টি গোল দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন পর্তুগিজ কিংবদন্তি। লিওনেল মেসি কিছুদিন আগেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন, আর এবার সেই পথেই হাঁটলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোও।
লিসবন থেকে মাদ্রিদ, রিয়াদ থেকে কলকাতা, ফুটবলপ্রেমী কোটি কোটি মানুষের মন আজ ভারাক্রান্ত। এক যুগের অবসান ঘটিয়ে রূপকথার মহাতারকার এই প্রস্থানে মানসিকভাবে শূন্যতা গ্রাস করছে গোটা ক্রীড়াজগৎকে।
Leave a comment