শিলিগুড়ি: চারদিকে আলোর রোশনাই আর উৎসবের মধুর আমেজে সেজে উঠেছে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার শিলিগুড়ি শহর। আর মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি দিনের অপেক্ষা, তারপরেই বাঙালির প্রাণের উৎসব শ্যামাপূজা বা কালীপুজো।
তবে কালীপুজোর মূল আনন্দের ঠিক প্রাক্কালেই ভূত চতুর্দশীর চৌকাঠ ছুঁয়ে বাঙালি মেতে উঠেছে তার শেকড়ের টানে। ভূত চতুর্দশীর আবশ্যিক রীতি অনুযায়ী চোদ্দো প্রদীপ জ্বালানোর সনাতন ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে শিলিগুড়ির বিভিন্ন বাজারে এখন উপচে পড়ছে ক্রেতাদের ভিড়।
আধুনিক চিনা লাইট বা ফ্যান্সি আলো যতই বাজার দখল করুক না কেন, ভূত চতুর্দশীর চৌহদ্দিতে মাটির প্রদীপের এই চিরন্তন চাহিদা দেখে লাভের মুখ দেখার আশায় বুক বাঁধছেন শহরের প্রবীণ মৃৎশিল্পী ও ছোট ব্যবসায়ীরা।
রবিবার সকাল থেকেই শিলিগুড়ির প্রধান বাজারগুলি ঘুরে দেখা গেল এক অপরূপ উৎসবের ছবি। রাস্তার দু’ধারে কিংবা ফুটপাথে সারি দিয়ে সাজানো রয়েছে রকমারি মাটির প্রদীপের পসরা। সনাতন সাধারণ প্রদীপের পাশাপাশি এ বার ক্রেতাদের মন কাড়তে বাজারে এসেছে নান্দনিক নকশা করা ও রঙিন প্রদীপও।
আরও পড়ুন: মালদহের ‘মাদকগড়ে’ এসটিএফের বিরাট ধাক্কা! ৩ কোটির মাদক উদ্ধার, পিঠ চাপড়ালেন মুখ্যমন্ত্রী!
স্থানীয় কারিগরদের নিপুণ হাতে তৈরি এই প্রদীপগুলি কেনার জন্য সকাল থেকেই সাধারণ মানুষের আনাগোনা বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গত দু’দিন ধরে প্রদীপ বিক্রির গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। শহরের নিজস্ব কারিগরদের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রাম ও এলাকা থেকেও ট্রাক্টর কিংবা ছোট গাড়িতে করে মাটির প্রদীপ নিয়ে বাজারে হাজির হয়েছেন বিক্রেতারা। কালীপুজোর দিন যত এগিয়ে আসবে, এই বিক্রি আরও বহুলাংশে বাড়বে বলেই তাঁরা প্রবল আশাবাদী।
বাঙালির সনাতন সমাজ ও ধর্মের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে নানা প্রাচীন রীতি ও সংস্কার। তার মধ্যে অন্যতম হলো ভূত চতুর্দশীর সন্ধ্যায় ঘরের আনাচে-কানাচে চৌদ্দটি প্রদীপ জ্বালানো এবং একই সঙ্গে চোদ্দো রকমের শাক ভক্ষণ করার প্রথা।
প্রচলিত বিশ্বাস ও লোকসংস্কৃতি অনুযায়ী, কার্তিক মাসের এই বিশেষ তিথিতে অশুভ শক্তি বিনাশ করতে এবং পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি ও স্মরণে বাড়ির অন্দরমহল থেকে সদর দরজা পর্যন্ত প্রদীপের আলো জ্বেলে দেওয়া হয়।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই পারিবারিক রীতি ও সংস্কার আজও আধুনিকতার যুগেও শহুরে বাঙালির উৎসবের বিন্দুমাত্র ঔজ্জ্বল্য হারায়নি। আর ঠিক সেই আদি এবং অকৃত্রিম ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেই শিলিগুড়ির হাটে-বাজারে এখন চলছে জোরদার কেনাকাটা।
বাজারের চিত্র বলছে, প্রদীপ কিনতে আসা ক্রেতাদের মুখেও ফুটে উঠেছে খুশির ঝিলিক। কেউ কেউ শুধু ভূত চতুর্দশীর নিয়ম রক্ষার্থে অবিকল চোদ্দোটি প্রদীপ কিনছেন, আবার কেউ পরিবারের সামগ্রিক প্রয়োজন ও উৎসাহের খাতিরে তার চেয়েও অনেক বেশি সংখ্যায় প্রদীপ ও মাটির অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করছেন। গৃহকর্ত্রীরা বাড়ির সদর দরজা, উঠোনের তুলসীতলা, রান্নাঘর থেকে শুরু করে কোণায় কোণায় প্রদীপ সাজানোর আগাম প্রস্তুতি সেরে ফেলছেন।
সব মিলিয়ে, কালীপুজোর প্রাক্কালে শিলিগুড়ির বাজারে মাটির প্রদীপকে কেন্দ্র করে এক আনন্দমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আধুনিকতার চকচকে ছোঁয়া যতই বাড়ুক না কেন, বাঙালির খাঁটি ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও সংস্কৃতিতে যে মাটির প্রদীপের গুরুত্ব আজও সম্পূর্ণ অমলিন, শিলিগুড়ির এই উৎসবমুখর বাজার তারই এক জলজ্যান্ত প্রমাণ। মাটির প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোয় কুসংস্কার ও অন্ধকার ভেদ করে শুভ শক্তির আবাহন ঘটুক, এই প্রার্থনাতেই এখন মেতে উঠেছে গোটা শিলিগুড়ি।
Leave a comment