নয়াদিল্লি: দিল্লির রাজপথে হুডখোলা গাড়ির সেই একটি দৃশ্যই যেন দেশের বিরোধী রাজনীতির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তনের কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল। রামলীলা ময়দানে ‘ইন্ডি’ (INDIA) জোটের ঐতিহাসিক মেগা সমাবেশে যোগ দিতে যাওয়ার পথে খোলা গাড়ির চালকের পাশের আসনে সগর্ভে বসে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী।
তাঁর ঠিক পিছনের সারিতে কাশ্মীরের প্রবীণ নেতা ফারুক আবদুল্লা ও সিপিআই সম্পাদক ডি রাজা। আর একেবারে তৃতীয় সারিতে সমাজবাদী পার্টির সর্বভারতীয় সভাপতি অখিলেশ যাদবের পাশে বসে রয়েছেন বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়!
ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে এসে পথে নেমে লড়াই করা যে নেত্রী এতদিন সমস্ত আন্দোলনের প্রথম সারিতে বুক চিতিয়ে থাকতেন, ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় তৃণমূলের ভরাডুবির পর সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই আজ বিরোধীদের যৌথ প্ল্যাটফর্মে দেখা গেল কিছুটা আড়ালে, ব্যাকফুটে।
ভোটাধিকার রক্ষা ও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে রবিবার রামলীলা ময়দানে বিরাট জনসভার আয়োজন করেছিল বিরোধী জোট। সমাবেশ সফল করতে সকাল থেকেই চরম টানটান উত্তেজনা জাতীয় রাজধানীতে।
কিন্তু সমস্ত রাজনৈতিক চর্চার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল রামলীলা ময়দানগামী একটি হুডখোলা গাড়ি এবং তার আসন বিন্যাস। যে জোট একসময় কার্যত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অঙ্গুলিহেলনে চালিত হত বলে মনে করত রাজনৈতিক মহল, সেই জোটের কর্মসূচিতেই এবার চালকের আসনে সুনির্দিষ্টভাবে দেখা গেল রাহুল গান্ধীকে।
আরও পড়ুন : ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’! মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে রাহুলের ‘চলো দিল্লি’
রাহুলের এই মধ্যমণি হয়ে ওঠার মুহূর্তে মমতাকে দেখা গেল কেবল সঙ্গত দেওয়ার ভূমিকায়। গাড়িতে প্রিয়ঙ্কা গান্ধী, সমাজবাদী পার্টি প্রধান অখিলেশ যাদব, এনসিপি সাংসদ সুপ্রিয়া সুলে, আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব এবং তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও উপস্থিত ছিলেন। তবে প্রথা ভেঙে তৃতীয় সারিতে ‘দিদি’র অবস্থান জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর হারানো প্রভাবকেই যেন বড় হরফে তুলে ধরল।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় তৃণমূলের নজিরবিহীন বিপর্যয়ের পরেই জোটের অন্দরে ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। একদা শাসক শিবিরের অন্দরে যে ভাঙন ধরেছে, তারই সরাসরি প্রতিফলন ঘটেছে দিল্লির রাস্তায়।
বিধানসভা ভোটের ফল বেরোনোর পরই বাংলায় বাম-কংগ্রেসের হাত ধরার বার্তা দিয়েছিলেন মমতা, যদিও রাজ্য স্তরে তার কোনও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার দিল্লি উড়ে গিয়ে রাহুল গান্ধী ও সনিয়া গান্ধীর সঙ্গে একের পর এক বৈঠক করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয় স্তরে নিজের প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখতে এবং অস্তিত্ব রক্ষা করতে কংগ্রেসের ‘হাত’ ধরা ছাড়া মমতার সামনে আর অন্য কোনও সহজ বিকল্প খোলা নেই।
এদিকে, এই মেগা সমাবেশকে কেন্দ্র করে রবিবাসরীয় দিল্লি কার্যত দুর্ভেদ্য সেনাছাউনিতে পরিণত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথাকথিত ‘ভোটচুরি’র প্রতিবাদে আয়োজিত এই জনসভাকে ঘিরে নিরাপত্তা এতটুকু শিথিল করতে চায়নি প্রশাসন।
শুধুমাত্র রামলীলা ময়দান এবং তার চারপাশের এলাকাতেই পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। আকাশপথে ও প্রবেশদ্বারে নজরদারির জন্য বসানো হয়েছে অন্তত ২০০টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত অত্যাধুনিক নজরদারি ক্যামেরা।
তবে কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপ পেরিয়ে দিল্লির রাজপথে বিরোধীদের এই হুডখোলা গাড়ির ছবিই কিন্তু স্পষ্ট করে দিল, চব্বিশের লড়াই থেকে ছাব্বিশের বিধানসভা পার হয়ে বিরোধী জোটের রাশ এখন পুরোটাই কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধীর কব্জায়, আর সেখানে মমতা এখন শুধুই পিছনের সারির অন্যতম শরিক।
Leave a comment