কলকাতা: আন্তর্জাতিক লাল বলের ক্রিকেটকে পাকাপাকিভাবে বিদায় জানালেন ভারতের অন্যতম সেরা পেসার মহম্মদ শামি। শুক্রবার গভীর রাতে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে একটি আবেগঘন ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের কথা ঘোষণা করেন ৩৬ বছর বয়সি এই তারকা বোলার।
কাকতালীয়ভাবে, ঠিক ১৩ বছর আগে ২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল শামির। টেস্ট জার্সিতে তাঁর টুপি নম্বর ছিল ২৭৯। আর ঠিক তেরো বছর পর সেই ৬ তারিখেই লাল বলের ক্রিকেট অধ্যায়ের ইতি টানলেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে ফিটনেস সংক্রান্ত বিতর্ক এবং দলে ব্রাত্য থাকার জেরে অভিমানের সুরেই তাঁর এই সিদ্ধান্ত বলে মনে করছে ক্রিকেট মহল।
শামির এই আচমকা অবসরের ঘোষণায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জাতীয় দলের প্রাক্তন হেড কোচ রবি শাস্ত্রী। অন্যদিকে, শামির বিদায়ে যথেষ্ট আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন ভারতের বর্তমান বোলিং কোচ মর্নি মর্কেল। সব মিলিয়ে শামির টেস্ট ছাড়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে ভারতীয় ক্রিকেটে শোরগোল পড়ে গেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার ভিডিও বার্তায় অনুরাগীদের উদ্দেশে শামি বলেন, ‘‘আজ আমি সকলকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। এই ছোট্ট গ্রাম থেকে উঠে এসে দেশের হয়ে খেলেছি। সবার আগে আল্লাকে ধন্যবাদ দেব, তিনি আমাকে ভাবনার থেকেও বেশি দিয়েছেন। মা-বাবা, পরিবার, সতীর্থদের কাছেও আমি কৃতজ্ঞ। প্রচুর পরিশ্রম করেছি, অনেক উত্থানপতন দেখেছি, কিন্তু কখনও হার মানিনি। ভারতীয় দলের জার্সির জন্য বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি। তাই এই ৬ নভেম্বর আমার কাছে অত্যন্ত বিশেষ। আজ আমার অভিষেকের তেরো বছর পূর্ণ হল। সমর্থকদেরও ধন্যবাদ জানাই, তাঁদের ভালোবাসার জন্যই আমার এই পরিচিতি। বিসিসিআই ও বাংলা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনকেও ধন্যবাদ জানাই।’’
আরও পড়ুন : বাংলাদেশের মাটিতে ‘সার্জিকাল স্ট্রাইক’, সাফ ফুটবলে উড়ে গেল পাকিস্তান!
২০১৩ সালের অভিষেক থেকে শুরু করে ২০২৩ সালের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল পর্যন্ত ভারতের লাল বলের বোলিং আক্রমণের অন্যতম প্রধান ভরসা ছিলেন শামি। দেশের হয়ে ৬৪টি টেস্ট ম্যাচ খেলে তিনি শিকার করেছেন মোট ২২৯টি উইকেট।
কিন্তু ২০২৩ সালের পর থেকে চোট-আঘাত এবং ফিটনেসের অজুহাতে তাঁকে আর জাতীয় টেস্ট দলে রাখা হয়নি। অথচ ঘরোয়া ক্রিকেটে নেমে রনজিতে নিয়মিত বল করে উইকেট তুলে নিজের ফিটনেস ও দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে গিয়েছেন তিনি। ঘরোয়া ক্রিকেটে দুরন্ত পারফর্ম করা সত্ত্বেও জাতীয় দলে ক্রমাগত অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হতেই শেষ পর্যন্ত এই কঠিন সিদ্ধান্ত নেন শামি।
শামির এই প্রস্থানে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তাঁর দীর্ঘদিনের গুরু তথা টিম ইন্ডিয়ার প্রাক্তন কোচ রবি শাস্ত্রী। শাস্ত্রীর আমলেই টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের সেরা সময় কাটিয়েছিলেন শামি। ক্ষুব্ধ শাস্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘‘শামি এখনও টেস্ট ক্রিকেটে অনায়াসে ৩০ থেকে ৪০টি উইকেট তুলতে পারত। ও আরও অন্তত এক বছর অনায়াসে আন্তর্জাতিক লাল বলের ক্রিকেট খেলতে পারত। এত বড় মাপের একজন বোলারকে এভাবে সরে যেতে দেখে সত্যিই খুব খারাপ লাগছে। আমি শুনেছি, ওর নাকি ফিটনেস ভালো নয়! তাহলে ও বাংলার হয়ে রনজিতে কীভাবে টানা ১৫-২০ ওভার বল করছে? একজন খেলোয়াড় আর কীভাবে নিজের ফিটনেস প্রমাণ করবে? আমি অত্যন্ত হতাশ যে নির্বাচকরা শামিকে আর একটাও সুযোগ দিলেন না।’’
শামির অবদান স্মরণ করে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন বর্তমান বোলিং কোচ মর্নি মর্কেলও। গৌতম গম্ভীর প্রধান কোচ হওয়ার পর দলে যোগ দেওয়া মর্কেল বলেন, ‘‘আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে শামির মতো বিশ্বমানের বোলারের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। ও অত্যন্ত দক্ষ একজন খেলোয়াড়। যখন আমি ভারতীয় দলে যোগ দিই, তখন আমার সঙ্গে মেশার ক্ষেত্রে ও ভীষণভাবে সাহায্য করেছিল। ওকে অবসর নিতে দেখা আমার জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে এটা ভালো লাগার বিষয় যে ও এখনও ঘরোয়া সাদা বলের ক্রিকেটে খেলা চালিয়ে যাচ্ছে।’’

যদিও শামি আন্তর্জাতিক টেস্ট ও ভারতের লাল বলের জার্সি তুলে রাখছেন, তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে সীমিত ওভারের সাদা বলের ক্রিকেটে খেলা চালিয়ে যাবেন। আইপিএল এবং ঘরোয়া সীমিত ওভারের টুর্নামেন্টেও তাঁকে দেখা যাবে।
তবে বাংলার হয়ে তিনি আর রনজি ট্রফি খেলবেন কি না, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত করে কিছু জানা যায়নি। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলার পরবর্তী রনজি ম্যাচ রয়েছে। আন্তর্জাতিক লাল বলের মঞ্চে ‘ম্যাজিশিয়ান’ শামির অভাব ভারতীয় দল দীর্ঘকাল অনুভব করবে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
Leave a comment