•
Home Top-News নেই ডাকাত, তবুও নামেই বেঁচে রোমাঞ্চ! মাজদিয়ায় দেড় শতকের ঐতিহ্য মেনে আজও পুজো পান ‘ডাকাতে কালী’
Top-Newsপশ্চিমবঙ্গ

নেই ডাকাত, তবুও নামেই বেঁচে রোমাঞ্চ! মাজদিয়ায় দেড় শতকের ঐতিহ্য মেনে আজও পুজো পান ‘ডাকাতে কালী’

Share
মাজদিয়ায় ডাকাত কালী। নিজস্ব ছবি
Share

মাজদিয়া: ব্রিটিশ জমানার রুদ্ধশ্বাস ইতিহাস আর লোককথার ধোঁয়াশা পেরিয়ে নদিয়ার বুক চিরে আজও বয়ে চলেছে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর উপাখ্যান। বর্তমানের চাকচিক্যময় আলোর রোশনাই কিংবা আধুনিকতার প্রলেপ তাকে ম্লান করতে পারেনি। 

নদিয়ার মাজদিয়ার ঘোষপাড়ায় আজও সমান মহিমায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘ডাকাতে কালী’র পুজো। ব্রিটিশ আমলের সেই দিনগুলিতে গরিব মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার ব্রত নিয়ে যে ডাকাতদল তলোয়ার হাতে তুলে নিয়েছিল, আজ তাদের রক্তমাংসের অস্তিত্ব না থাকলেও, তাদের আরাধ্য দেবী কালীর নামের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে সেই রোমাঞ্চকর অতীত। প্রায় ১১১ বছরের প্রাচীন এই পুজো আজ নিছক একটি আচার নয়, বরং নদীর জল ও মেঠো পথের সুতোয় বোনা এক জীবন্ত কিংবদন্তি।

কালের নিয়মে সেই যুগের কুশীলবরা আজ অতীত। কিন্তু লোকমুখে ফেরে সেই ইতিহাসের জন্মলগ্নের কথা। সময়টা আজ থেকে প্রায় একশো এগারো বছর আগের এক অগ্নিগর্ভ কাল। চারদিকে চলছে ব্রিটিশদের দমনপীড়ন। মাজদিয়া গ্রামের সাধারণ মানুষের ঘরে তখন দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের সংস্থান করাও দায়। 

সেই চরম অনাহার ও অভাবের দিনে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে গ্রামেরই কয়েকজন তরতাজা যুবক এক বেপরোয়া সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা ঠিক করেন, পেট চালানোর দায়ে তাঁরা পথপাবে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের রূপেই বেছে নেবেন ডাকাতি। সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন দুলাল প্রামাণিক, হেমন্ত বিশ্বাস, ভরত সর্দার, কৃত্তিবাস মিত্র, অবিনাশ ক্যারিয়া এবং গিরীন্দ্রনাথ ঘোষের মতো যুবকেরা।

আরও পড়ুন : গণনার অতীত অনন্য রূপ, দেড় শতক পেরিয়েও শিবপুরের হাজার হাত কালীতলায় রহস্য

ইতিমধ্যেই খবর আসে, ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে ব্রিটিশদের একটি মালবাহী ট্রেন। মাজদিয়ার ইছামতি ব্রিজের ওপর দিয়ে যখন কুঝিকঝিক শব্দে ট্রেনটি এগোচ্ছে, তখন অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে রেললাইনের ওপরে লাল লণ্ঠন দেখিয়ে ট্রেন থামিয়ে দেন সেই যুবকেরা। 

মুহূর্তের মধ্যে ট্রেনের বগি থেকে চাল, ডাল ও কাপড়ের বান্ডিল লুট করে তা ফেলে দেওয়া হয় ইছামতির জলে। ব্রিটিশ পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজলেও নদীর জলের তলায় লুকিয়ে রাখা সেই কাপড়ের সন্ধান পায়নি। পরবর্তীতে সেই কাপড় ও খাদ্যসামগ্রী গরিব মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন ওই যুবকেরা। কিন্তু ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিতে তাঁরা আশ্রয় নেন গভীর জঙ্গলে। 

ঘাত-প্রতিঘাতের সেই দিনগুলিতে পুলিশের তাড়া খেয়ে জঙ্গল থেকেই তাঁরা কায়মনোবাক্যে স্মরণ করেছিলেন মা কালীকে। বলেছিলেন, ‘মা, আমাদের বাঁচাও, আমরা তোমার পুজো দেব।’ অলৌকিকভাবেই সেদিন ব্রিটিশ বাহিনীর নাগাল থেকে রক্ষা পান তাঁরা।

অমাবস্যার রাতে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে একটি বেল ও নিম গাছের নিচে মাটির বেদি বানিয়ে প্রথম শুরু হয় সেই পুজো। ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকা প্রতিমাশিল্পী ভূদেব মালাকারকে ধরে এনে রাতারাতি তৈরি করানো হয় মূর্তি। চক্রবর্তী পরিবারের এক সদস্যকে দিয়ে বাধ্য করা হয় পুজো করাতে। 

আরও পড়ুন : চলবে না বারমুন্ডা, লুঙ্গি! কালীপুজোয় তারাপীঠে নতুন ড্রেস কোড

ডাকাত হলেও এই দলটির এক অদ্ভুত নীতি ছিল তাঁরা কখনো কাউকে খুন করতেন না এবং লুট করা সমস্ত সম্পদ তুলে দিতেন গরিবের হাতে। এমনকি, কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি কিংবা রাজকোষেও নাকি তাঁরা হানা দিয়েছিলেন। 

পুলিশের চোখে ধুলো দিতে একবার তো থানায় আটক থাকার সময়েও কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থেকে রাতের অন্ধকারে ডাকাতি সেরে এসে আবার কম্বলের তলায় শুয়ে পড়ার মতো রোমাঞ্চকর গল্প আজও মুখে মুখে ফেরে মাজদিয়া জুড়ে। পরবর্তীতে বাংলাদেশের দর্শনায় এক রানির মুখোমুখি হওয়ার পর দেবীর অলৌকিক আদেশে তাঁরা চিরতরে ডাকাতির পথ ছেড়ে দেন।

আজ সেই ডাকাতদের বংশধরেরা কেউ শিক্ষক, কেউ পুলিশকর্মী, কেউ বা আবার দেশের সেবা করছেন সেনবাহিনীতে। কিন্তু পূর্বপুরুষদের স্মৃতিকে বুকে ধারণ করে ঘোষপাড়ার মানুষ আজও মহা সমারোহে পালন করেন এই পুজো। 

স্থানীয় প্রবীণ থেকে গৃহবধূ নমিতা শর্মা সকলের কাছেই এই কালী অত্যন্ত জাগ্রত। দীপাবলির দিন পাঁঠা বলির মাধ্যমে পুজো সম্পন্ন হওয়ার পর, প্রথা মেনে ভাইটুজদ্বিতীয়ার দিন কাঁধে করে অথবা সুসজ্জিত টানা গাড়িতে করে সমগ্র মাজদিয়া বাজার পরিক্রমা করান হয় মাকে। 

প্রতিমা বাজারের প্রতিটি দোকানের সামনে পৌঁছলে ব্যবসায়ীরা জল ও বাতাসা দিয়ে মাকে মিষ্টিমুখ করান। হাজার হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই উৎসব আজ রূপ নিয়েছে এলাকার সর্বজনীন আবেগে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *