পাকইয়ং: পাহাড়ি স্বর্গের বুকে নেমে এলো এক বিভীষিকাময় অন্ধকার। উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক প্রজেক্টে কাজ করতে গিয়ে ঘাতক ধসের নিচে চাপা পড়লেন বহু শ্রমিক। সিকিমের পাকইয়ং জেলার সামারদুং (ঝোলুঙ্গে) এলাকায় নির্মীয়মাণ টানেলে সোমবার দুপুরে হঠাৎ নেমে আসা ভয়াবহ ভূমিধসে তলিয়ে গেছে একাধিক প্রাণ। এখনও পর্যন্ত অন্তত ৮ জনের নিথর দেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে ১২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও, মাটির গভীরে বিষাক্ত বাতাসের মধ্যে এখনও চরম জীবন-মৃত্যুর পাঞ্জা লড়ছেন ১৮ বা তারও বেশি শ্রমিক।
প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রাণ বাঁচিয়ে বেরিয়ে আসা শ্রমিকদের কথায়, সোমবার দুপুরটা আর পাঁচটা দিনের মতো স্বাভাবিক ছিল না। টানেলের ভেতরের গভীরতায় যখন কাজ চলছিল, ঠিক তখনই আচমকা কেঁপে ওঠে চারপাশ। এক প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিক জানান, হঠাৎ করেই বিকট একটা বিস্ফোরণের মতো শব্দ শুনতে পান তাঁরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারদিক থেকে হুড়মুড়িয়ে নেমে আসে ধসের পাথর আর কাদা। ভয়ের চোটে যে যেদিকে পেরেছেন ছুট লাগিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছে, ভেতরের অংশে আটকে পড়েন বহু সহকর্মী। কীভাবে এই আকস্মিক বিপর্যয় ঘটল, তা নিয়ে এখনও গভীর ধোঁয়াশা রয়েছে।
যে টানেলে এই নারকীয় দৃশ্য তৈরি হয়েছে, তা সিকিমের সড়ক ইতিহাসে এক বিশেষ মাইলফলক হতে চলেছিল। প্রায় ২৫০ মিটার দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গটি সিকিমের প্রথম ডাবল-লেন টানেল হিসেবে গড়ে উঠছিল। পূর্ব সিকিমের পাকইয়ং জেলার নামচি ও রংপো সংলগ্ন মামরিং এলাকায় ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে, তিস্তা স্টেজ-৪ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছাকাছি এই মেগা প্রজেক্টের কাজ চলায় স্বাভাবিকভাবেই ব্যস্ততা ছিল তুঙ্গে। কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই টানেল চালু হলে একদিকে যেমন গ্যাংটকমুখী পর্যটকদের পথ সহজ হতো, তেমনই নাথু-লা পাসের দিকে সেনার কনভয় চলাচলেও বড় সাফল্য আসত। কিন্তু স্বপ্নপূরণের আগেই তা পরিণত হলো এক থমথমে সমাধিক্ষেত্রে।
টানেলের বাইরে যখন স্বজনহারাদের আর্তনাদ, তখন ভেতরে চলছে সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই। খবর পাওয়ামাত্রই জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF) যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারে নেমেছে। এলাকাটিকে ঘিরে রাখা হয়েছে এবং ভারি যন্ত্রপাতি দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। তবে উদ্ধারকাজ এগোতেই প্রকাশ্যে এসেছে এক ভয়ঙ্কর তথ্য। যে অংশে শ্রমিকরা এখনও আটকে রয়েছেন, সেখানে প্রবল মাত্রায় মিথেন গ্যাস লিক করতে শুরু করেছে। বিষাক্ত বাতাসের কারণে উদ্ধ উদ্ধারকারীদের কাছেও ভেতরে পৌঁছানো অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে অতি বৃষ্টির লাল সতর্কতা, অন্যদিকে ভেতরে ঘনিয়ে আসা মিথেনের চাদর—সব মিলিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত এখন রুদ্ধশ্বাস।
হিডেন স্টোরিজ নিউজ

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুলাই ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন