৫ আগস্ট, ২০২৪। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সরকার ছাত্র ও জনআন্দোলনের চাপে ক্ষমতা ছাড়ে। তখন দেশ ও বিদেশে অনেকেই ভেবেছিলেন—এটাই হয়তো গণতন্ত্রে ফেরার প্রথম ধাপ। মানবাধিকারও ফিরবে স্বাভাবিক ধারায়। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে, মাত্র ষোলো মাসের মধ্যেই তারা সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র তুলে ধরেছে।
এই সরকার এক ভিন্ন শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছে। কার্যত সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে শাসন চলছে। আইনকে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করা হয়েছে। রাস্তায় নামা জনতার চাপে বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সামগ্রিকভাবে দেশ গভীর সংকটে নিমজ্জিত। এটি কেবল গণতান্ত্রিক সংকট নয়—এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অস্তিত্বের সংকট।
সম্প্রতি ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ)-এর এক প্রতিবেদনে বিশ্বের নানা দেশে সংসদ সদস্যদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র উঠে এসেছে। তবে বাংলাদেশ নিয়ে তাদের বিশেষ উদ্বেগ পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। বিশেষ করে সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর ঘটনা। একসময় তিনি আইপিইউ মানবাধিকার কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্তমানে তিনি কারাগারে চরম মানবিক ও চিকিৎসা সংকটে রয়েছেন।
২৩ অক্টোবর ২০২৫-এর আইপিইউ প্রস্তাবে বলা হয়েছে—বাংলাদেশে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গ্রেফতার, অস্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বাধা দেওয়া এবং নিয়মিত মানবাধিকার লঙ্ঘন এখন সরকারের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
দেশের ভেতরের বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে এশিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস (ACHR)। তাদের রিপোর্টে বলা হয়েছে—অন্তর্বর্তী সরকারের ষোলো মাসে প্রায় সব মৌলিক অধিকারই লঙ্ঘিত হয়েছে। আইনের শাসনের জায়গা নিয়েছে ভয় ও প্রতিশোধের রাজনীতি।
এই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ হলো মিথ্যা মামলার স্রোত। সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা সমতা ও নিরাপত্তার অধিকার কার্যত ভেঙে পড়েছে। অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণে মামলার শিকার হয়েছেন ৫ লক্ষ ১৯ হাজার ৮৯ জন। এর মধ্যে ৮০ হাজারের বেশি পরিচিত ব্যক্তি, চার লক্ষেরও বেশি অজ্ঞাতনামা। এমনকি ৩৪৪ জন সাবেক সাংসদ এই মামলার তালিকায়। বহুজনের বিরুদ্ধে সরাসরি খুনের অভিযোগ আনা হয়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও এক শ্রমিককে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছে। বহু মামলার বাদী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকে জানেনই না, তাঁদের নামেও মামলা হয়েছে।
শত শত ভুয়ো মামলা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। আগস্ট ২০২৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। বন্দিদের উপর অমানবিক আচরণ ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। এই সংখ্যাগুলি কেবল পরিসংখ্যান নয়—এগুলি এক ভয়ংকর মানবাধিকার বিপর্যয়ের দলিল।
গণগ্রেফতার ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বেপরোয়া প্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। ‘ফ্যাসিবাদে জড়িত’ অভিযোগে ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেফতার হয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ এখনও কারাগারে। সন্ত্রাসবিরোধী আইন হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক বিরোধীদের ধ্বংস করার হাতিয়ার। প্রতিদিন নতুন মামলা, নতুন গ্রেফতার। সত্তর-আশি বছরের অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকরাও রেহাই পাচ্ছেন না। শুধু কোনও সভায় যোগ দেওয়ার জন্যই তাঁদের ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষক, লেখক, শিল্পীরাও যখন রাষ্ট্রের সন্দেহভাজন হয়ে ওঠেন, তখন স্পষ্ট—এখানে ন্যায়বিচার নয়, লক্ষ্য একটাই—বিরোধী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করা।
সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের উপর নিপীড়ন আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। আগস্ট ২০২৪ থেকে জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত ২,৪৮৫টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। দুর্গাপুজোর সময় বিভিন্ন জেলায় মন্দির ও বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ হয়েছে। সরকার সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ।
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, পার্বত্য এলাকায় মারমা যুবকদের উপর গুলি চালানো হয়। তিনজন নিহত, দশজন আহত। এতে প্রমাণিত হয়—আদিবাসীদের অধিকার আজও সুরক্ষিত নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকদের রক্ষা করা। অন্তর্বর্তী সরকার সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ।
বিচারব্যবস্থার উপর আঘাত ছিল নজিরবিহীন। সংবিধান অনুযায়ী, কোনও বিচারপতিকে অপসারণ করতে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার জনচাপের কাছে নতিস্বীকার করে প্রধান বিচারপতি-সহ ২১ জন বিচারপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করে। কোনও তদন্ত হয়নি। কোনও অভিশংসন হয়নি। আজ বিচার আর আইনে নির্ধারিত হয় না—নির্ধারিত হয় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা স্লোগানে।
২০২৫ সালের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়। এর আগে আদালত একই দাবি খারিজ করেছিল। কিন্তু সরকার নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়। ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কাঠামো ভেঙে পড়ে। বহুদলীয় গণতন্ত্র সংকটে পড়ে।
সাংবাদিকতাও প্রবল চাপে। ১,০৮৭ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা, হামলা বা গ্রেফতার হয়েছে। অন্তত ৪৪ জন সাইবার সিকিউরিটি আইনে আটক। আজ সরকারের সমালোচনা মানেই ঝুঁকি নেওয়া।
ষোলো মাস পর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক ভয়াবহ সন্ধিক্ষণে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি—জবাবদিহি, স্বাধীনতা, নির্বাচন—বাস্তবে রূপ নিয়েছে গ্রেফতার, সেন্সরশিপ ও বিচারব্যবস্থার ধ্বংসে। এটি কেবল ব্যর্থতা নয়—এটি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ভেঙে দেওয়ার এক প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশের মানুষ আরও ভালো কিছুর যোগ্য। তারা অধিকার চায়, মর্যাদা চায়, গণতন্ত্র চায়। তারা চায় স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ—এক নৈরাজ্যকর অন্তর্বর্তী শাসন নয়।

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৫

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন