ঢাকা: এটি কি নিছক প্রশাসনিক গাফিলতি, না কি পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনী নথি “শোধন”-এর চেষ্টা? এক প্রার্থীর হলফনামা ঘিরে উঠে আসা তথ্য ও অভিযোগ ক্রমশ গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন-কে। অভিযোগ, গুরুতর অনিয়ম প্রকাশ্যে আসার পর রাতারাতি আগের হলফনামা সরিয়ে নতুন নথি আপলোড করা হয়েছে।
যেসব হলফনামা বাতিল হওয়ার কথা ছিল
আপিল সূত্র ও নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে থাকা নথি খতিয়ে দেখে দেখা যাচ্ছে, প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদা-র জমা দেওয়া হলফনামায় এমন একাধিক ঘাটতি ছিল, যা নির্বাচন আইন অনুযায়ী মনোনয়নপত্র বাতিলের জন্য যথেষ্ট। তবুও সেই হলফনামার ভিত্তিতেই মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়।
নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব নির্দেশিকাতেই স্পষ্ট বলা রয়েছে—মনোনয়ন ফরমের কোনও ঘর ফাঁকা রাখা যাবে না, হলফনামা অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ হতে হবে এবং আইনসম্মতভাবে সত্যায়িত থাকতে হবে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাস্তবে এর কোনওটাই মানা হয়নি।
হলফনামায় নেই যা যা থাকা বাধ্যতামূলক
আপিলে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট হলফনামায়—
প্রার্থীর স্বাক্ষর অনুপস্থিত,
তারিখ নেই,
ছবি সংযুক্ত করা হয়নি,
এবং সবচেয়ে গুরুতর বিষয়—প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা নোটারি পাবলিক দ্বারা কোনও সত্যায়নই হয়নি।
আইনজ্ঞদের মতে, এ ধরনের একটি নথি নির্বাচন আইনের চোখে আদৌ হলফনামা হিসেবে গণ্য হয় কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।
ভুল, অসম্পূর্ণ ও ফাঁকা তথ্য—এক নজরে
শুধু আনুষ্ঠানিক ত্রুটিই নয়, হলফনামার ভেতরের তথ্য নিয়েও উঠেছে বিস্ফোরক অভিযোগ।
নথি অনুযায়ী—
৩ নম্বর কলামের ‘খ’ অনুচ্ছেদে দেওয়া হয়েছে ভুল তথ্য,
৩ নম্বর কলামের ‘গ’ অনুচ্ছেদ অসম্পূর্ণ,
৭ নম্বর কলামের ‘ক’ অনুচ্ছেদে ভুল তথ্য,
৭ নম্বর কলামের ‘খ’ অনুচ্ছেদ অসম্পূর্ণ,
৭ নম্বর কলামের ‘গ’ অনুচ্ছেদ পুরো ফাঁকা,
৮ নম্বর কলাম সম্পূর্ণ ফাঁকা,
১০ নম্বর কলামের ‘ক’ অনুচ্ছেদে ভুল তথ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আর “ভুলবশত বাদ পড়া” নয়—এটি তথ্য গোপন ও বিভ্রান্ত করার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
যাচাই-বাছাইয়ের দিন কী করলেন রিটার্নিং অফিসার?
সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে ৩ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের দিন জেলা রিটার্নিং অফিসারের ভূমিকা নিয়ে। এত স্পষ্ট ও একাধিক ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও কেন কোনও আপত্তি তোলা হয়নি? কীভাবে এই মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হল?
আপিলকারীর বক্তব্য, “আইন মেনে যদি হলফনামা যাচাই হতো, তাহলে এই মনোনয়নপত্র গ্রহণের কোনও সুযোগই থাকত না।” প্রশ্ন উঠছে—এটি কি গাফিলতি, না কি ইচ্ছাকৃত উপেক্ষা?
সংবাদ প্রকাশের পরই বদলে গেল নথি?
স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, জাতীয় স্তরের গণমাধ্যমে অনিয়মের খবর প্রকাশের পরই আগের হলফনামা সরিয়ে নতুন হলফনামা আপলোড করা হয়েছে।
তাঁর প্রশ্ন, “যে হলফনামার অনিয়মের কারণে মনোনয়ন বাতিল হওয়ার কথা ছিল, সেটিতেই পরে কীভাবে পরিবর্তন আনা হল?” তাঁর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
গণতন্ত্রের জন্য কতটা বিপজ্জনক?
বিশ্লেষকদের মতে, হলফনামা কোনও সাধারণ কাগজ নয়। এটি ভোটারদের সামনে প্রার্থীর সম্পদ, দায়-দেনা ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের একটি সাংবিধানিক দলিল। সেখানে তথ্য গোপন, ভুল তথ্য বা পরবর্তীতে নথি পরিবর্তনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে, তা সরাসরি ভোটারদের অধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এখন মূল প্রশ্ন একটাই—
নির্বাচনী নথিতে রাতারাতি পরিবর্তনের ক্ষমতা কার আছে?
আর সেই ক্ষমতা কার স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর না মিললে, শুধু একটি মনোনয়ন নয়—পুরো নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন