কলকাতা: বিধানসভা নির্বাচনের ঘণ্টা বাজার আগেই রাজ্য বনাম নির্বাচন কমিশন সংঘাত এক নতুন মোড় নিল। নবান্নের পাঠানো তালিকার জন্য অপেক্ষা না করে কমিশন নিজেই বেছে নিল রাজ্যের ১৫ জন দাপুটে আমলা ও পুলিশ আধিকারিককে। বুধবার এই তালিকা সামনে আসতেই জল্পনা শুরু হয়েছে—তবে কি সরকার ঘনিষ্ঠ অফিসারদের ভোটের আগেই সুকৌশলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মূল স্রোত থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে কমিশন?
নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজের জন্য রাজ্য সরকারের কাছে আধিকারিকদের নামের তালিকা চেয়ে পাঠায় নির্বাচন কমিশন। জানা গিয়েছে, কমিশন অনেক আগেই এই তালিকা চেয়ে পাঠালেও রাজ্য সরকার তা নির্দিষ্ট সময়ে জমা দেয়নি। রাজ্যের এই ‘ঢিলেমি’র পাল্টা হিসেবে এবার কড়া পদক্ষেপ করল কমিশন। অপেক্ষা না করে নিজেদের পছন্দমতো ১৫ জন অফিসারের নাম চূড়ান্ত করে রাজ্যের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কাদের বেছে নিল কমিশন?
কমিশনের পাঠানো তালিকায় দুই ধরনের আধিকারিক রয়েছেন—আইএএস এবং আইপিএস।
১৫ জন আইএএস আধিকারিকের তালিকা (ব্যাচ ৩): নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী, আগামী ০৬.০২.২০২৬ তারিখ সকাল ৯টা থেকে এই আইএএস অফিসারদের ব্রিফিং বা ট্রেনিং শুরু হবে। এই তালিকায় রয়েছেন:
অশ্বিনী কুমার যাদব (২০০১), সেলিম পি বি (২০০১)।
অবনীন্দ্র সিং (২০০২), সৌমিত্র মোহন (২০০২), স্মারকী মহাপাত্র (২০০২), অর্চনা (২০০২)।
জগদীশ প্রসাদ মীনা (২০০৪), সঞ্জয় বনসাল (২০০৪), পি মোহনগান্ধী (২০০৪)।
শুভঞ্জন দাস (২০০৫), পি উলগানাথন (২০০৬), সৌরভ পাহাড়ি (২০০৮), রচনা ভগত (২০০৯)।
ঋতেন্দ্র নারায়ণ বসু রায়চৌধুরী (২০১০) এবং রজনবীর সিং কাপুর (২০১২)।
১০ জন আইপিএস আধিকারিকের তালিকা (ব্যাচ ১): আইপিএস আধিকারিকদের ট্রেনিং বা ব্রিফিং শুরু হবে ০৫.০২.২০২৬ তারিখ থেকে। এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য নামগুলি হলো:
ভারত লাল মীনা (২০০২), রাজেশ কুমার যাদব (২০০২)।
প্রবীণ কুমার ত্রিপাঠী (২০০৪), ঋষিকেশ মীনা (২০০৪), সব্যসাচী রমন মিশ্র (২০০৪), সুনীল কুমার চৌধুরী (২০০৪)।
অখিলেশ কুমার চতুর্বেদী (২০০৫), সুকেশ কুমার জৈন (২০০৫), অনুপ জয়সওয়াল (২০০৬) এবং সুধীর কুমার নীলকান্তম (২০০৭)।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই আধিকারিকদের নির্বাচনী প্রশিক্ষণ দিয়ে ভিন রাজ্যে পর্যবেক্ষক হিসেবে পাঠানো হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি রাজ্য সরকারের ওপর একটি ‘পরোক্ষ চাপ’ বা ইনডাইরেক্ট প্রেসার। বিরোধী দলগুলি বারবার অভিযোগ করে, কিছু আইএএস ও আইপিএস অফিসার শাসক দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে কাজ করেন। কমিশন তাঁদের ভিন রাজ্যে পাঠিয়ে দেওয়ায় ভোটের সময় বাংলায় প্রশাসন এই আধিকারিকদের নিজেদের 'সুবিধামতো' ব্যাবহার করতে পারবেন না বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহেলর একাংশ। রাজ্য নাম পাঠাতে দেরি করায় কমিশন যেন বুঝিয়ে দিল, বাংলার প্রশাসনকে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়েও তারা নিজেদের কাজ চালিয়ে নিতে পারে।
এই ঘটনা নিয়ে ইতিমধ্যেই শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, "অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের লক্ষ্যে এটি কমিশনের সময়োপযোগী পদক্ষেপ।" অন্যদিকে, শাসক শিবিরের একাংশ মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্যকে এড়িয়ে এভাবে অফিসারদের নাম চূড়ান্ত করা বাঞ্ছনীয় নয়।
রাজ্য এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যে এই সংঘাত নতুন নয়। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাসে অতীতেও একাধিকবার নবান্নকে এড়িয়ে বা রাজ্য প্রশাসনের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করে কমিশনকে কড়া পদক্ষেপ করতে দেখা গিয়েছে।
রাজ্য প্রশাসনের পাঠানো আধিকারিকদের তালিকার তোয়াক্কা না করে কমিশনের এই সরাসরি হস্তক্ষেপ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নজিরবিহীন হলেও একেবারে প্রথম নয়।
২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচন: একুশের ভোটের আগেও রাজ্য-কমিশন সংঘাত চরমে উঠেছিল। সেই সময় নবান্নের তীব্র আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন পুলিশ ডিরেক্টর জেনারেল (DGP) বীরেন্দ্রকে সরিয়ে দিয়েছিল কমিশন। এমনকি, ভোটের ঠিক আগে আগে বহু পুলিশ সুপার (SP) ও জেলাশাসককে (DM) সরিয়ে দিয়ে কমিশন নিজেদের পছন্দের আধিকারিকদের বসিয়েছিল।
২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচন: উনিশের ভোটের সময়ও তৎকালীন কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারকে সরিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে একাধিক দাপুটে আইপিএস অফিসারের ডানা ছেঁটেছিল কমিশন।
২০১৬-র নির্বাচন: সেই বছরেও অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটের স্বার্থে প্রশাসনকে পাশ কাটিয়ে প্রায় ৮০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন এবং স্পর্শকাতর বুথগুলিতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ নিয়ে নবান্নের সাথে সরাসরি দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিল নির্বাচন কমিশন।
সাধারণত দেখা যায়, যখনই রাজ্য সরকারের দেওয়া অফিসারদের তালিকায় ‘পক্ষপাতিত্বের’ অভিযোগ ওঠে বা সময়মতো তালিকা জমা পড়ে না, তখনই নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক অধিকার বলে নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করে। ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটের আগেও নবান্নকে এড়িয়ে ১৫ জন অফিসারের এই নতুন তালিকা সেই পুরনো সংঘাতের ইতিহাসকেই ফের মনে করিয়ে দিচ্ছে।
হিডেন স্টোরিজ নিউজ, কলকাতা

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন