কলকাতা: ক্যালেন্ডারের পাতায় আরও এক শুক্রবার। আর, সেই শুক্রবারই ফের এক ভয়াবহ আতঙ্কের সাক্ষী থাকল কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ অংশ। ২৭ ফেব্রুয়ারি (২০২৬), শুক্রবার দুপুরে ঘড়ির কাঁটায় যখন ব্যস্ত সময়, তখনই হঠাৎ কেঁপে উঠল তিলোত্তমা। রিখটার স্কেলে ৫ মাত্রার এই কম্পন স্থায়ী ছিল প্রায় ৫২ সেকেন্ড। কম্পনের উৎসস্থল প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের সাতক্ষীরা ও খুলনা এলাকা হলেও, তার রেশ যেভাবে কলকাতায় অনুভূত হয়েছে, তাতে নতুন করে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
শুক্রবার বিকেলের প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে শহরবাসীর মনে এখন একটাই প্রশ্ন, কলকাতা কি বড় কোনও ভূমিকম্পের কেন্দ্রবিন্দু হতে চলেছে? ভূবিজ্ঞানীদের মতে, কলকাতার ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। শহরটি মূলত একটি বড় ফল্টলাইন বা চ্যুতিরেখার উপর দাঁড়িয়ে আছে, যা মায়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত।
ভূবিজ্ঞানী অমিতাভ মল্লিকের মতে, "কলকাতা সরাসরি হিমালয়ের কম্পন বলয়ের রেশ পায়। সিসমিক জোন ম্যাপ অনুযায়ী, কলকাতা ৩ এবং ৪ নম্বর জোনের বর্ডার লাইনে দাঁড়িয়ে। ফলে বড় মাত্রার কম্পনের ঝুঁকি এখানে সব সময়েই বর্তমান।"
ইনস্টিটিউট অব টাউন প্ল্যানার্স-এর প্রাক্তন কাউন্সিল সদস্য দীপঙ্কর সিনহা এক মারাত্মক বিপদের কথা শুনিয়েছেন। তাঁর মতে, ইন্ডিয়ান প্লেট প্রতি বছর প্রায় ৫ সেন্টিমিটার করে তিব্বতীয় প্লেটের দিকে সরে যাচ্ছে। এই দুই প্লেটের সংঘর্ষের ফলেই তৈরি হচ্ছে কম্পন। এদিকে, শহরজুড়ে অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ জল তোলার ফলে মাটির নীচে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। যা ভূমিধসের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। কলকাতার নীচে থাকা গভীর ফাটলের মধ্য দিয়ে কম্পনের ঢেউ এগোলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।
শিবপুর আইআইইএসটি (IIEST)-র ভূবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ভবানীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই পরিস্থিতিতেও একটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কলকাতার নীচে থাকা হুগলি নদীর বালি ও কাদার নরম স্তর বা 'সেডিমেন্টারি লেয়ার' অনেকটা শক-অ্যাবজর্ভারের মতো কাজ করে। শুক্রবার ৫.৭ মাত্রার (উৎসস্থলে) কম্পন হওয়া সত্ত্বেও কলকাতা যে বড় ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে গেল, তার পিছনে এই নরম মাটির স্তরের কম্পন শুষে নেওয়ার ক্ষমতা বড় ভূমিকা পালন করেছে। তবে তাঁর হুঁশিয়ারি, "কম্পনের মাত্রা আরও বাড়লে এই সুরক্ষা স্তর আর কাজ করবে না।"
ভূবিজ্ঞানীরা একযোগে জানিয়েছেন, ভূমিকম্প রোখা সম্ভব নয়। তবে, সঠিক পরিকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। বিশেষ করে পুরনো ও জীর্ণ বহুতল এবং নতুন তৈরি হওয়া আকাশচুম্বী আবাসনগুলির ক্ষেত্রে ভূমিকম্প-প্রতিরোধী প্রযুক্তি (Seismic Design) মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা উচিত। নয়তো কোনও একদিন বড় মাত্রার কম্পনে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে তিলোত্তমার তিল তিল করে গড়ে ওঠা স্থাপত্য!
বিষয় : Kolkata Earth Quake Fault Line

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন