বিশ্ব রাজনীতিতে প্রবাদ আছে— ‘রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রু বা মিত্র বলে কিছু নেই, আছে কেবল স্থায়ী স্বার্থ।’ বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে চিনের ভূমিকা যেন এই প্রবাদকেই ফের সত্য প্রমাণ করছে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে চিনের দুই অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু— ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরো এবং ইরানের আয়াতোল্লা খামেনেইকে ক্ষমতাচ্যুত ও নিকেশ করেছে আমেরিকা। মাদুরো এখন নিউ ইয়র্কের ডিটেনশন সেন্টারে, আর খামেনেইয়ের দাফনের প্রস্তুতি চলছে মাশহাদে। অথচ এই পরিস্থিতিতে বেজিংয়ের নীরবতা গোটা বিশ্বকে অবাক করছে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদদের মতে, শি জিনপিং এখন ‘ঠান্ডা মাথার বাস্তববাদী’ নীতিতে চলছেন। ওয়াশিংটনের থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক বিশ্লেষক ক্রেগ সিঙ্গলটনের মতে, চিন আসলে ‘সুসময়ের বন্ধু’। তারা ঝুঁকি নিতে চায় না। চিনের বর্তমান অগ্রাধিকার হলো আমেরিকার সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা। বিশেষ করে এই মাসের শেষে বেজিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং শি জিনপিংয়ের যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা, তার আগে ইরান বা ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি কোনো সংঘাতে জড়িয়ে জল ঘোলা করতে চাইছে না চিন।
চিন ইরানের তেলের বৃহত্তম ক্রেতা ঠিকই, কিন্তু পশ্চিম এশিয়ায় তাদের বৃহত্তর স্বার্থ জড়িয়ে আছে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে। বেলজিয়ামের থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মতে, বর্তমানে ইরান ইস্যুর চেয়ে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা বেজিংয়ের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাষ্ট্রপুঞ্জে দায়সারা প্রতিবাদ জানালেও কার্যত ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ নীতিই অবলম্বন করছে তারা।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত চিনের জন্য পুরোপুরি সুবিধাজনক নয়। চিনের মোট তেল আমদানির এক-তৃতীয়াংশ আসে এই অঞ্চল থেকে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে চিনের জ্বালানি সরবরাহ বড় ধাক্কা খাবে। তবে চিন আগে থেকেই সতর্ক। তাদের কাছে বর্তমানে প্রায় ১২০ কোটি ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে, যা দিয়ে অন্তত ১১৫ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। পাশাপাশি রাশিয়ার বিকল্প পথ তো খোলাই আছে।
মাদুরো ও খামেনেইয়ের পতনে চিনের এই সীমিত ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে— সংকটের সময় কি চিন তার মিত্রদের পাশে দাঁড়ায় না? গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে চিন নিজেকে কতটা ‘নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে তুলে ধরতে পারবে, তা নিয়ে বড়সড় সংশয় তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, আমেরিকা যখন সামরিক শক্তিতে ব্যস্ত, চিন তখন ‘অহস্তক্ষেপ’ নীতি প্রচার করে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর মন জয়ের চেষ্টা করছে। তবে মিত্রদের চরম দুর্দিনে এই হাত গুটিয়ে বসে থাকা কি দীর্ঘমেয়াদে চিনের কূটনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে? উত্তর লুকিয়ে রয়েছে জিনপিংয়ের পরবর্তী পদক্ষেপেই।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ মার্চ ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন