Hidden Stories (বাংলা)
সর্বশেষ

বিশ্বযুদ্ধের ছায়া ও জ্বালানি সঙ্কট: ছাব্বিশের ভোটের আগে বাংলায় কি ফিরছে ‘লকডাউন’ আতঙ্ক?

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬
বিশ্বযুদ্ধের ছায়া ও জ্বালানি সঙ্কট: ছাব্বিশের ভোটের আগে বাংলায় কি ফিরছে ‘লকডাউন’ আতঙ্ক?

কলকাতা: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, বাংলার রাজনৈতিক রণকৌশল ততই জটিল হচ্ছে। এবার সেই লড়াইয়ের ময়দানে ঢুকে পড়ল এক আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। একদিকে পশ্চিম এশিয়ায় ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, অন্যদিকে ভারতে রান্নার গ্যাসের জোগান ও ‘লকডাউন’ পরিস্থিতি নিয়ে ছড়ানো জল্পনা। এই দুইয়ের মেলবন্ধনে পশ্চিমবঙ্গের ভোটমুখী রাজনীতিতে নতুন এক ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ উস্কে দিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।


বৃহস্পতিবার পাণ্ডবেশ্বরের নির্বাচনী জনসভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি আক্রমণ শানিয়েছেন মোদী-শাহ জুটিকে। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার রান্নার গ্যাসের জোগান নিয়ে নতুন কোনও ফন্দি আঁটছে। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, গ্যাস বুকিংয়ের সময়সীমা কমিয়ে ২৫ দিন করার যে কথা শোনা যাচ্ছে, তা যদি সত্যি হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠবে। শুধু তাই নয়, তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, জ্বালানি সঙ্কটের দোহাই দিয়ে দেশে ফের লকডাউন সদৃশ কোনও কড়াকড়ি বা ‘অ্যালার্ট’ জারি করতে পারে কেন্দ্র। মমতার সাফ কথা, “ওদের আমি বিশ্বাস করি না। তবে, কোভিডে যদি লড়াই করতে পারি, এবারও পারব।”


আসলে এই আতঙ্কের সূত্রপাত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি সাম্প্রতিক সংসদীয় ভাষণ থেকে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ভারতকে ঐক্যবদ্ধ থাকার ডাক দেন এবং উদাহরণ হিসাবে কোভিড অতিমারির সময়কার লড়াইয়ের কথা মনে করিয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখে ‘কোভিড’ ও ‘প্রস্তুতি’— এই দুই শব্দের উপস্থিতি সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে গুগল ট্রেন্ডস-এ ‘India Lockdown 2026’ বা ‘Lockdown Again’ শব্দগুলি ট্রেন্ডিং হতে শুরু করে। যদিও সরকারিভাবে লকডাউনের কোনও সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, সাতটি বিশেষ ‘এমপাওয়ার্ড গ্রুপ’ তৈরি করার সিদ্ধান্ত জনমনে কিছুটা হলেও সংশয় তৈরি করেছে।


এনার্জি লকডাউন: এশিয়ার নতুন বিপদ

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘এনার্জি লকডাউন’ বা জ্বালানি সংকটের কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। হরমোজ প্রণালীতে উত্তেজনার কারণে ভারতের মতো দেশগুলো, যারা আমদানিকৃত তেলের ওপর ৬০ শতাংশ নির্ভরশীল, তারা বড়সড় ঝুঁকির মুখে। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানে ইতিমধ্য়েই জ্বালানি বাঁচাতে মানুষকে ঘরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশেও সারের কারখানা বন্ধ রাখা বা পাম্পে দীর্ঘ লাইনের ছবি স্পষ্ট। ভারত যদিও রাশিয়ার কাছ থেকে বাড়তি তেল কিনে এবং আর্জেন্টিনার মতো দেশ থেকে এলপিজি এনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) বিঘ্নিত হওয়ার ভয়টা থেকেই যাচ্ছে।


পশ্চিমবঙ্গের নিরিখে এই পরিস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তৃণমূল কংগ্রেসের রণনীতি খুবই স্পষ্ট - গ্যাসের চড়া দাম এবং জোগানের সমস্যাকে সরাসরি মোদী সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরা। ছাব্বিশের নির্বাচনে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের পাশে এই ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’কে বড় ইস্যু করতে চাইছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, এসআইআর বা ডি-ভোটার তালিকার মতো জ্বালানি নিয়েও কেন্দ্র রাজ্যবাসীকে বিপাকে ফেলতে চায়।


অন্যদিকে, বিজেপি এই লকডাউন জল্পনাকে নিছক ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। তবে, যুদ্ধের ফলে যদি বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, তবে তার প্রভাব দেশের মুদ্রাস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের পকেটে পড়বেই। আর সেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া সামলানোই এখন কেন্দ্রের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।


শেষ পর্যন্ত এই ‘লকডাউন আতঙ্ক’ কি কেবল নির্বাচনী গিমিক হিসেবে রয়ে যাবে, নাকি বিশ্ব রাজনীতির প্রভাবে বাংলার হেঁশেলে সত্যিই টান পড়বে — তার উত্তর দেবে সময়। তবে, আপাতত ছাব্বিশের লড়াইয়ে ‘গ্যাস’ আর ‘লকডাউন’ যে তুরুপের তাস হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।

বিষয় : Mamata Banerjee Lock Down

আপনার মতামত লিখুন

Hidden Stories (বাংলা)

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬


বিশ্বযুদ্ধের ছায়া ও জ্বালানি সঙ্কট: ছাব্বিশের ভোটের আগে বাংলায় কি ফিরছে ‘লকডাউন’ আতঙ্ক?

প্রকাশের তারিখ : ২৬ মার্চ ২০২৬

featured Image
কলকাতা: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, বাংলার রাজনৈতিক রণকৌশল ততই জটিল হচ্ছে। এবার সেই লড়াইয়ের ময়দানে ঢুকে পড়ল এক আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। একদিকে পশ্চিম এশিয়ায় ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, অন্যদিকে ভারতে রান্নার গ্যাসের জোগান ও ‘লকডাউন’ পরিস্থিতি নিয়ে ছড়ানো জল্পনা। এই দুইয়ের মেলবন্ধনে পশ্চিমবঙ্গের ভোটমুখী রাজনীতিতে নতুন এক ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ উস্কে দিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।বৃহস্পতিবার পাণ্ডবেশ্বরের নির্বাচনী জনসভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি আক্রমণ শানিয়েছেন মোদী-শাহ জুটিকে। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার রান্নার গ্যাসের জোগান নিয়ে নতুন কোনও ফন্দি আঁটছে। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, গ্যাস বুকিংয়ের সময়সীমা কমিয়ে ২৫ দিন করার যে কথা শোনা যাচ্ছে, তা যদি সত্যি হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠবে। শুধু তাই নয়, তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, জ্বালানি সঙ্কটের দোহাই দিয়ে দেশে ফের লকডাউন সদৃশ কোনও কড়াকড়ি বা ‘অ্যালার্ট’ জারি করতে পারে কেন্দ্র। মমতার সাফ কথা, “ওদের আমি বিশ্বাস করি না। তবে, কোভিডে যদি লড়াই করতে পারি, এবারও পারব।”আসলে এই আতঙ্কের সূত্রপাত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি সাম্প্রতিক সংসদীয় ভাষণ থেকে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ভারতকে ঐক্যবদ্ধ থাকার ডাক দেন এবং উদাহরণ হিসাবে কোভিড অতিমারির সময়কার লড়াইয়ের কথা মনে করিয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখে ‘কোভিড’ ও ‘প্রস্তুতি’— এই দুই শব্দের উপস্থিতি সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে গুগল ট্রেন্ডস-এ ‘India Lockdown 2026’ বা ‘Lockdown Again’ শব্দগুলি ট্রেন্ডিং হতে শুরু করে। যদিও সরকারিভাবে লকডাউনের কোনও সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, সাতটি বিশেষ ‘এমপাওয়ার্ড গ্রুপ’ তৈরি করার সিদ্ধান্ত জনমনে কিছুটা হলেও সংশয় তৈরি করেছে।এনার্জি লকডাউন: এশিয়ার নতুন বিপদআন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘এনার্জি লকডাউন’ বা জ্বালানি সংকটের কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। হরমোজ প্রণালীতে উত্তেজনার কারণে ভারতের মতো দেশগুলো, যারা আমদানিকৃত তেলের ওপর ৬০ শতাংশ নির্ভরশীল, তারা বড়সড় ঝুঁকির মুখে। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানে ইতিমধ্য়েই জ্বালানি বাঁচাতে মানুষকে ঘরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশেও সারের কারখানা বন্ধ রাখা বা পাম্পে দীর্ঘ লাইনের ছবি স্পষ্ট। ভারত যদিও রাশিয়ার কাছ থেকে বাড়তি তেল কিনে এবং আর্জেন্টিনার মতো দেশ থেকে এলপিজি এনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) বিঘ্নিত হওয়ার ভয়টা থেকেই যাচ্ছে।পশ্চিমবঙ্গের নিরিখে এই পরিস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তৃণমূল কংগ্রেসের রণনীতি খুবই স্পষ্ট - গ্যাসের চড়া দাম এবং জোগানের সমস্যাকে সরাসরি মোদী সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরা। ছাব্বিশের নির্বাচনে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের পাশে এই ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’কে বড় ইস্যু করতে চাইছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, এসআইআর বা ডি-ভোটার তালিকার মতো জ্বালানি নিয়েও কেন্দ্র রাজ্যবাসীকে বিপাকে ফেলতে চায়।অন্যদিকে, বিজেপি এই লকডাউন জল্পনাকে নিছক ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। তবে, যুদ্ধের ফলে যদি বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, তবে তার প্রভাব দেশের মুদ্রাস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের পকেটে পড়বেই। আর সেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া সামলানোই এখন কেন্দ্রের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।শেষ পর্যন্ত এই ‘লকডাউন আতঙ্ক’ কি কেবল নির্বাচনী গিমিক হিসেবে রয়ে যাবে, নাকি বিশ্ব রাজনীতির প্রভাবে বাংলার হেঁশেলে সত্যিই টান পড়বে — তার উত্তর দেবে সময়। তবে, আপাতত ছাব্বিশের লড়াইয়ে ‘গ্যাস’ আর ‘লকডাউন’ যে তুরুপের তাস হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।

Hidden Stories (বাংলা)


কপিরাইট © ২০২৬ Hidden Stories (বাংলা) । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

দৃষ্টি আকর্ষণ

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।

— হিডেন স্টোরিজ পরিবার