নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা :রাত পোহালেই পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬। এর আগের দিন শনিবার পুলিশ সদর দপ্তর ও পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে আবেগঘন এক আবেদন করেছেন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকর্তারা। চিঠিতে লিখেছেন, জুলাই আন্দোলনে তারা শুধুমাত্র চেনই অব কমান্ড পালন করেছেন। এর কারণে পুলিশকে হত্যার শিকার হতে হয়েছে যার বিচার আজও হয়নি। অথচ বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা পুলিশ সদস্যদের দিয়ে ভুয়া মামলা করানো ও হয়রানি করা হচ্ছে। একই চিঠি পৌঁছে গেছে দেশের সব থানা ও ইউনিটগুলোতেও।
এমন চিঠি পাওয়ার বিষয়ে পুলিশের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা নিশ্চিত করেনি। তবে নাম প্রকাশ না করে মাঠপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেছেন, বিভিন্ন মাধ্যম থেকে চিঠিটি আমরা পেয়েছি।
উলেখ্য, জুলাই আন্দোলনে শেষ হাসিনার সরকারের পতন হলে প্রতিরোধের মুখে পরে পুলিশ বাহিনী। আন্দোলনকারীদের মধ্যে জঙ্গি ঢুকে নির্বিচারে হত্যা করা হয় পুলিশকে। সরকারী হিসাব বলছে ৪৪ পুলিশকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে। গত প্রায় দুই বছর ধরে শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা মিথ্যা মামলায় জেলে রয়েছেন। কয়েকশ কর্মকর্তা দেশ ছেড়েছেন। অনেকে দেশের মধ্যে পলাতক।
নির্যাতিত ওইসব পুলিশ সদস্যদের পক্ষ থেকে দেওয়া আবেগঘন সেই চিঠি হুবহু তুলে ধরা হল:
প্রিয় সহকর্মী,
আজ আপনি যে চেয়ারে বসে আছেন, একদিন সেখানে আমরাই ছিলাম। কখনও আমি আপনার অধীনে ছিলাম, কখনো আপনি আমার, কিংবা আমরা ছিলাম সমান্তরাল পথের সঙ্গী, একই পরিবারের অংশ। কত রাত আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাটিয়েছি, কত বিপদ একসাথে মোকাবিলা করেছি। অথচ নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস দেখুন! আমাদের মাঝে আজ লোহার গরাদ। আমাদের নতুন পরিচয়, আমি ‘অপরাধী’, আর আপনি ‘পুলিশ’। আজ আমার বিচার করার ভার আপনার হাতে! এই বিচিত্র পরিচয়ে কি আপনি গর্ববোধ করেন? আপনার বুক কি একবারও যন্ত্রণায় কেঁপে ওঠে না?
একবার ভেবে দেখুন তো, আপনার সহকর্মী এমন কী জঘন্য কাজ করেছে যে, তার ছবিটা কুখ্যাত কোনো সন্ত্রাসীর পাশে ঝুলছে? যাকে আপনি ‘স্যার’ বা ‘ভাই’ বলে ডাকতেন, তাকেই আজ আসামী বানিয়ে হাজতে রাখছেন। মনে রাখবেন, আপনি যে চার্জশিট লিখছেন, সেটা চার্জশিট নয়, আপনার সহকর্মীর মৃত্যুদণ্ড। আপনি যা লিখছেন তা আপনার নিজেরই ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। আজ আমি কাঠগড়ায়, কাল হয়তো আপনি। সময় বড় নির্দয়, সে কাউকে ছেড়ে দেয় না।
পুলিশ সবসময় ক্ষমতার অনুগামী। গতকাল যারা আওয়ামী লীগের কথায় উঠেছেন-বসেছেন, আজ তারা বিএনপির নির্দেশ মানছেন, আওয়ামী লীগ আসলে কাল আবার জয় বাংলা শ্লোগান দিবে। জুলাই আন্দোলনে আমরা যা করেছি, তা ছিল স্রেফ ‘চেইন অফ কমান্ড’, আদেশের বাস্তবায়ন। সেই আদেশ লঙ্ঘনের সাহস কিংবা সুযোগ আমাদের কারোই ছিল না। এই নির্মম বাস্তবতা জেনেও কেন আমাদের ওপর জুলুম করছেন? কেন নির্বিচারে মিথ্যা মামলা দিচ্ছেন, কেন মিথ্যা মামলা নিচ্ছেন, কেন বানোয়াট সাক্ষী দিচ্ছেন, কেন মিথ্যা সাজার প্লট সাজাচ্ছেন? কোনো সরকারই কিন্তু চিরস্থায়ী নয়। সরকার বদলাবে, কিন্তু এই অন্যায়ের নথিপত্র থেকে যাবে, থেকে যাবেন আপনারা। আজ আমাদের পাশে কেউ নেই, কাল আপনাদের পাশেও কেউ থাকবে না। তাই সময় থাকতে সদয় হোন। আমাদের পরিণতি দেখে শিক্ষা নিন। জুলুমের এই চাকা বন্ধ করুন। নিজেকে রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হতে দেবেন না। অন্যের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থে নিজেরই সহকর্মীর শত্রু হবেন কেন? মনে রাখবেন, উর্দিটা খুলে ফেললে আমরা সবাই এক। আর বিচারটা যখন প্রকৃতির আদালতে হয়, তখন পালানোর কোনো পথ থাকে না।
এতদিনে নিশ্চয়ই বুঝেছেন, বিপদে সবাই পুলিশের ছায়া খোঁজে, অথচ দুর্দিনে সেই পুলিশের পাশে আজ কেউ নেই। পুলিশ সবার জন্য হলেও পুলিশের জন্য কেউ না! তাই বলে কি পুলিশও পুলিশের প্রতিপক্ষ হয়ে যাবে? অন্তত এবার সজাগ হোন, শিরদাঁড়া সোজা করে দাড়াঁন। আমাদের পক্ষে থাকতে না পারুন, দয়া করে বিপক্ষে অবস্থান নেবেন না। পোশাকের সম্মান রক্ষা করুন, ইউনিফর্ম যেন ইউনিফর্মের রক্ত না চোষে। ক্ষমতার মোহে কিংবা আনুগত্যের দুর্বলতায় মিথ্যা মামলা, সাজানো সাক্ষী আর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চার্জশিটে নিজের সহকর্মীকে অন্তত বলি দেবেন না। মনে রাখবেন, পুলিশ হয়ে অন্য পুলিশকে হয়রানি করা মানে নিজের হয়রানির রাস্তা প্রশস্ত করা। ইতিহাস সাক্ষী, ঘরের শত্রু বিভীষণরা কখনোই নিরাপদ থাকে না।অন্তত আমাদের পুলিশ পরিবার যেন পুলিশের আস্থার জায়গা হয়, আতঙ্কের নয়।
কাকের স্বভাব আর মানুষের বিচারবোধ কি তবে এক সমান্তরালে এসে দাঁড়াবে? কাক কাকের মাংস খায় না, কিন্তু পুলিশ কেন নিজের ভাইয়ের বুকেই আজ কুড়াল মারছে? পুলিশের বিরুদ্ধে পুলিশের মামলা, সাক্ষী আর চার্জশিটের এই আত্মঘাতী খেলা এবার বন্ধ করুন। আজ আপনি আমাকে মারলে কাল আমিও আপনাকে মারব। আজ আমি মার খেলে কাল আপনারও মার খাওয়া নিশ্চিত। মনে রাখবেন, বিপদে পড়লে এই বাহিনীই আপনার একমাত্র পরিবার। ইউনিফর্ম ছিঁড়ে ফেললে দিনশেষে আপনিও একা। এই ইউনিফর্ম আপনার অহংকার, একে কলঙ্কিত করবেন না। তাই সহকর্মীর বিপদে ঢাল হয়ে দাড়ান, পুলিশের পক্ষ নিন। সমব্যথী হোন, ঘাতক নন। পুলিশের বিরুদ্ধে অন্যায় হলে সরব হোন। ডিপার্টমেন্টের ভেতরে জনমত গড়ে তুলুন। প্রতিটি পুলিশ হত্যার বিচার না পাওয়া পর্যন্ত থামবেন না। নিজের ঘর পুড়িয়ে অন্যের উঠোন আলোকিত করা, আর না।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন