কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর নির্বাচনী বিপর্যয়ের ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে এখন নিজেদের ভুলেই কার্যত হাত কামড়াচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের অন্দরেই এখন বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধের ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ হেল্পলাইন প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে। দলের একাংশের আক্ষেপ, সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের আঁচ যদি এই হেল্পলাইনের মাধ্যমে সঠিক সময়ে শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পৌঁছাত, তাহলে হয়তো বিধানসভা নির্বাচনে এমন ভরাডুবি এড়ানো যেত। ২০২১ সালে যা সামাল দিতে পেরেছিল ‘দিদিকে বলো’, ২০২৬-এর ভোটে তা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’।
২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে ধাক্কা খাওয়ার পর ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক-এর মস্তিস্কপ্রসূত ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচি ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। প্রশান্ত কিশোরের পেশাদার কর্মীরা সরাসরি অভিযোগ শুনে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করায় ২০২১-এর ভোটে তার সুফল পেয়েছিল শাসকদল। কিন্তু, ২০২৩ সালের জুনে যখন নতুন মোড়কে ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ চালু হল, তখন তার দায়িত্ব দেওয়া হল সরকারি আমলাদের হাতে। আমজনতার অভিজ্ঞতা বলছে, আইপ্যাক-এর সেই পেশাদারিত্বের অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে হেল্পলাইনে ফোন করলে বেশির ভাগ সময় তা বেজেই যেত, কেউ ধরত না। আর কেউ ধরলেও স্রেফ আশ্বাস মিলত, কাজের কাজ কিছুই হত না। ফলে ধীরে ধীরে মানুষ এই নম্বর ভুলেই যায়।
নবান্ন ও তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সূত্রে চাঞ্চল্যকর দাবি উঠেছে, এই হেল্পলাইনে আসা বহু গুরুতর অভিযোগ খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কান পর্যন্ত পৌঁছতেই দেওয়া হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, জঙ্গলমহলের এক আদিবাসী মন্ত্রীর ‘বিশেষ বন্ধু’র দাপট ও দুর্নীতি নিয়ে ক্ষুব্ধ জনতা এই নম্বরে বহু ফোন করেছিলেন। একইভাবে দক্ষিণবঙ্গের এক প্রভাবশালী জেলা সভাধিপতির বিরুদ্ধেও ভূরি ভূরি অভিযোগ জমা পড়েছিল। কিন্তু, আমলারা সেইসব অভিযোগ ধামাচাপা দিয়ে রাখায় ওই নেতাদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপই করা যায়নি। খোদ মমতার কেন্দ্র ভবানীপুরেও প্রোমোটিং ও তোলাবাজি নিয়ে আসা ফোনগুলিকে কোনও গুরুত্বই দেওয়া হয়নি বলে মানছেন খোদ সরকারি আধিকারিকদের একাংশ।
এবারের নির্বাচনে দক্ষিণবঙ্গের ‘আলুবলয়’ অর্থাৎ পূর্ব বর্ধমান, হুগলি ও পশ্চিম মেদিনীপুরে কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে তৃণমূল। অথচ এই জেলাগুলিতে দলের সাংগঠনিক দাপট ছিল প্রশ্নাতীত। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, আলু চাষ ও বিপণন নিয়ে রাজ্য সরকারের ভুল নীতির কারণে চাষিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। নিজেদের দুর্দশার কথা জানাতে কৃষকরা ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ হেল্পলাইনে বারবার ফোন করেছিলেন। কিন্তু, উদাসীন প্রশাসন সেই ক্ষোভের গুরুত্ব বোঝেনি। দলের নেতাদের আক্ষেপ, হেল্পলাইনটা ঠিকঠাক কাজ করলে মমতা হয়তো চাষিদের মন বুঝতে পারতেন এবং দক্ষিণবঙ্গের এই শক্তিশালী ঘাঁটিগুলি এভাবে হাতছাড়া হতো না।
২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির আসন কমতেই তৎকালীন শাসক শিবিরের মধ্যে একধরনের আত্মতুষ্টি তৈরি হয়েছিল। ফলে ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ প্রকল্পটিকে পুরোপুরি বিস্মৃতির আড়ালে চলে যেতে দেওয়া হয়। তবে দলের অন্দরে যখন এই আত্মসমালোচনা তীব্র, তখন প্রকাশ্যে এই ব্যর্থতা মানতে নারাজ প্রবীণ তৃণমূল নেতা তথা বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ উপকৃত হয়েছেন এবং তিনি কৃষিমন্ত্রী থাকাকালীন এর সুফলও পেয়েছেন। তাঁর মতে, এবারের নির্বাচন হয়েছে সম্পূর্ণ ধর্মীয় উন্মাদনার ওপর ভিত্তি করে, তাই একে প্রকল্পের ব্যর্থতা বলা ভুল হবে। যদিও দলের সিংহভাগ নেতাই মনে করছেন, আমজনতার ক্ষোভকে গুরুত্ব না দেওয়ার খেসারতই দিতে হল তৃণমূলকে।

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন