সুরগুজা: বিজ্ঞাপনে কিংবা সরকারি নথির পাতায় ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র প্রবল ঢক্কানিনাদ আর আকাশছোঁয়া সাফল্যের খতিয়ান। কিন্তু ভারতের প্রত্যন্ত প্রান্তের আসল বাস্তবচিত্রটা যে কতটা নির্মম ও রূঢ়, তা আরও একবার গোটা দেশের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ছত্তীসগঢ়ের এক ঘটনা।
পেনশনের মাত্র কয়েকটা টাকার জন্য ৯০ বছরের বৃদ্ধা শাশুড়িকে নিজের পিঠে চাপিয়ে দীর্ঘ ৯ কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি ও জঙ্গলের পথ পাড়ি দিলেন এক গৃহবধূ। সমাজমাধ্যমে এই মর্মস্পর্শী ও হাহাকারের দৃশ্য ভাইরাল হতেই দেশজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে। রূপকথার ‘বিক্রম-বেতাল’-এর গল্পকেও হার মানানো এই দৃশ্য আসলে খোদ প্রশাসনের অমানবিক ও কঙ্কালসার পরিকাঠামোকেই আমজনতার সামনে উলঙ্গ করে দিয়েছে।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে ছত্তীসগঢ়ের সুরগুজা জেলার মৈনপত অঞ্চলের এক আদিবাসী অধ্যুষিত প্রত্যন্ত বনভূমিতে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, কাঠফাটা রোদের মধ্যে এক আদিবাসী মহিলা তাঁর ৯০ বছর বয়সি অশক্ত শাশুড়িকে পিঠে বেঁধে জঙ্গল, পাহাড় আর রুক্ষ নদী-নালা পেরিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলেছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই লড়াকু গৃহবধূর নাম সুখমানিয়া বাই।
তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, প্রতি মাসে তাঁর শাশুড়ি ১,৫০০ টাকা করে সরকারি বার্ধক্য ভাতা বা পেনশন পান। আগে নিয়ম মেনে সরকারি কর্মীরাই গ্রামে এসে এই টাকা দিয়ে যেতেন। কিন্তু ডিজিটাল ব্যবস্থার দোহাই দিয়ে বর্তমানে সেই পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ। এখন ব্যাঙ্কের কড়া ফতোয়া— পেনশন তুলতে গেলে ৯০ বছরের বৃদ্ধাকে সশরীরে ব্যাঙ্কের কাউন্টারে উপস্থিত হতেই হবে, কারণ আঙুলের ছাপ বা বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন ছাড়া সিস্টেমে টাকা মিলবে না!
সুখমানিয়া বাইদের গ্রামে নেই কোনও পিচ রাস্তা, আর দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় পৌঁছায় না কোনও গণপরিবহন বা বাস-অটো। ফলে পেটের তাগিদে ওই সামান্য টাকার জন্য প্রতি মাসে নিরুপায় সুখমানিয়া নিজের পিঠে শাশুড়িকে তুলে এই ভয়ঙ্কর ধকল সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছেন। এই ঘটনা সামনে আসতেই খোদ ছত্তীসগঢ় সরকারের জনকল্যাণমুখী নীতি ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সরব হয়েছেন দেশের তাবড় সমাজকর্মীরা।
তাঁদের সাফ কথা, একদিকে যখন প্রযুক্তির ডানা মেলে সমস্ত পরিষেবা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার দাবি করা হচ্ছে, তখন অন্য প্রান্তে সামান্য সরকারি উদাসীনতা ও নূন্যতম পরিকাঠামোর অভাবে দেশের প্রান্তিক আদিবাসী মানুষগুলো নিজেদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নীতি নির্ধারণ এবং তার বাস্তবায়নের মধ্যে যে কত বড় মহাসমুদ্রের মতো ফাঁক থেকে গিয়েছে, মৈনপতের এই ঘটনা তারই এক জ্বলন্ত এবং লজ্জাজনক প্রমাণ।

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন