রিয়াধ: টার্মিনাল বিল্ডিংয়ের ভেতরে তখন থিকথিক করছে ভিড়।
যাত্রীদের বড় অংশই বিমানে ওঠার অপেক্ষায় পাসপোর্ট-টিকিট হাতে টার্মিনালে দাঁড়িয়েছিলেন। হঠাৎই এক ঝিলিক আগুনের প্রকাণ্ড গোলা, আর তার পরই কানফাটা বিস্ফোরণ! হুড়মুড় করে ধসে পড়ল রিয়াধের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৪ নম্বর টার্মিনালের ছাদের একাংশ। আগুনের শিখা আর ঘন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেল চারপাশ। প্রাণ বাঁচাতে যে যে দিকে পারলেন ছোটাছুটি শুরু করলেন। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দমুখর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রূপ নিল এক রক্তসংক্রান্ত ধ্বংসস্তূপে।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের পর পর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় কেঁপে উঠল সৌদি আরবের রাজধানী। গত পাঁচ দিনে চার-চার বার রিয়াধ বিমানবন্দরে হামলা চালায় বিদ্রোহীরা। সব চেয়ে মারাত্মক হামলাটি ঘটে শনিবারে। একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি টার্মিনাল ৪-এ এসে পড়ে। এতে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে এক ভারতীয় নাগরিকও রয়েছেন।
অন্ধ্রপ্রদেশের হায়দরাবাদের বাসিন্দা ওই ব্যক্তি পরিবার নিয়ে মদিনায় যাচ্ছিলেন। হামলায় জখম ৩০০-রও বেশি। রবিবারেও নতুন করে হামলা চালানো হয়, যাতে আরও এক জনের মৃত্যু হয় ও ১১ জন আহত হন। এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম দিয়ে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভেস্তে দেওয়া সম্ভব হলেও অগ্নিকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ এড়ানো যায়নি। টানা হামলায় সৌদির আকাশসীমা ও বিমানবন্দর কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় রিয়াধের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সমস্ত উড়ান চলাচল আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন মহলে। এয়ার ইন্ডিয়া, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা সৌদিতে ফ্লাইট সাময়িক ভাবে বন্ধ করার ঘোষণা করেছে।
ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন তাদের নাগরিকদের সতর্ক করে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি দেখে রিয়াধের সমস্ত স্কুল-কলেজে সশরীরে পঠনপাঠন বন্ধ রেখে অনলাইন ক্লাস শুরু করা হয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট এই হামলাকে ‘পুরোদস্তুর যুদ্ধাপরাধ’ আখ্যা দিয়ে কড়া পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। হুথি মিলিটারি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা রিয়াধের পাশাপাশি দাম্মাম বিমানবন্দর ও তেল সংস্থা ‘সৌদি আরামকো’-র একাধিক ঘাঁটিতেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হানা চালিয়েছে। তাদের দাবি, সৌদির আকাশসীমা ও বিমানবন্দরগুলি এখন থেকে তাদের ‘অপারেশন থিয়েটার’। ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলার পাল্টা হিসেবেই এই পদক্ষেপ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মেঘ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান, ইয়েমেন ও সৌদিকে কেন্দ্র করে যে সংঘাতের সূত্রপাত, তা এখন আন্তর্জাতিক মাত্রা নিচ্ছে। আমেরিকা এই যুদ্ধে সরাসরি সৌদি আরবের পক্ষে যোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুথিদের দমনে সৌদি বিমানহানায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি ওয়াশিংটন গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। অন্য দিকে, ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, রিয়াধ ও ইয়েমেনের মধ্যে শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত তেহরান। সব মিলিয়ে, বিশ্ববাজারে তেলের দর এবং আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের সুরক্ষায় এই নতুন যুদ্ধ ক্ষেত্র তীব্র অস্থিরতা তৈরি করেছে।

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন