Hidden Stories (বাংলা)

Boeing 737: নকশার জেরেই নাকানিচোবানি থেকে রক্ষা! কী ভাবে অলৌকিক প্রাণরক্ষা বোয়িংয়ের?

ওয়াশিংটন: প্রায় ৩৩ হাজার ফুট উঁচুতে বিমানের ককপিটে তখন রক্তক্ষয়ী লড়াই। এক চালকের উপর আচমকাই হামলা চালিয়েছেন তাঁরই সহ-চালক। আতঙ্কে সিঁটিয়ে যাত্রীরা। আর এই হুলস্থুলের মাঝেই আচমকা মাটির দিকে খাড়াভাবে নামতে শুরু করল বিমানটি! পতনের গতিবেগ মিনিটে প্রায় ৩২ হাজার ফুট! যে গতি ও চাপের মুখে পড়ে সাধারণ বিমান বা যাত্রীদের টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া ছিল সময়ের অপেক্ষা, সেখানে অলৌকিক ভাবে নিয়ন্ত্রণে এল উড়ান। ডানা ভাঙা অবস্থাতেই সৌদির তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করল ফ্লাইদুবাইয়ের 'বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স'।ঘটনার পর থেকে গোটা বিমান পরিবহণ বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে এই ভেবে যে, এমন এক অকল্পনীয় মৃত্যুফাঁদ থেকে ১৭০ জন যাত্রী বেঁচে ফিরলেন কী করে? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে তামাম অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা এখন এক বাক্যে কুর্নিশ জানাচ্ছেন বোয়িংয়ের প্রযুক্তি ও নকশাকে। ককপিটে রক্তক্ষয়ী মারামারি আর যাত্রীদের অসমসাহসী প্রতিরোধ নিশ্চয়ই ছিল, কিন্তু বিজ্ঞানের পরিভাষায় আসল 'হিরো' বোয়িংয়ের সেই নকশা, যা ধ্বংসের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেও যাত্রীদের মৃত্যুমুখ থেকে ফিরিয়ে আনল।চরম সীমার নিরাপত্তা পরীক্ষা: শব্দের কাছাকাছি গতি সামলাল বিমানপ্রতিটি বাণিজ্যিক বিমান বাজারে নামানোর আগে বেশ কিছু নির্দিষ্ট সুরক্ষাবিধি মেনে পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু বিমান তৈরিতে বোয়িং যে প্রকৌশল বা ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবহার করে, তা সাধারণ সীমার থেকে বহু গুণ বেশি দুর্যোগ সহ্য করতে সক্ষম। দুর্ঘটনার সময় ফ্লাইদুবাইয়ের এই বিমানটির গতি পৌঁছে গিয়েছিল ঘণ্টায় প্রায় ৬৯০ মাইলে, যা প্রায় শব্দের গতির কাছাকাছি!ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FAA)-এর প্রাক্তন প্রধান বিমান চালক বব স্টোনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, একটি বিমান তার স্বাভাবিক সর্বোচ্চ যে গতি সহ্য করতে পারে, পরীক্ষার সময় তাকে intentionally তার চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলা হয়। ডানায় চরম চাপ সৃষ্টি করা থেকে শুরু করে কাঠামোর সহনশীলতা পরীক্ষা—সবটাই করা হয় এমন আচমকা চরম বিপদের কথা মাথায় রেখে। ফলে প্রতি মিনিটে ৩২,০০০ ফুট বেগে নামার পর যে প্রচণ্ড 'জি-ফোর্স' তৈরি হয়েছিল (যা সাধারণত ফাইটার জেটের পাইলটরা অনুভব করেন), তাকেও অনায়াসে তুচ্ছ করে বিমানটির মূল খাঁচা অক্ষত থেকে যায়।ভাঙা ডানাতেও নিয়ন্ত্রণ বজায়: মাল্টিপল রেডান্ডেন্সির ক্ষমতাসৌদি আরবের মাটিতে বিমানটি যখন স্পর্শ করে, তখন দেখা যায় বিমানের 'রাডার' (যা লেজের অংশ থেকে বিমানের দিক নিয়ন্ত্রণ করে)-এর একটি বড় অংশই ভেঙে উড়ে গিয়েছে! অ্যাভিয়েশনের ভাষায় যা এক কথায় চরম বিপর্যয়।কিন্তু এখানেই বোয়িংয়ের আধুনিক টেকনোলজির কেরামতি। বোয়িং তাদের বিমানে 'মাল্টিপল রেডান্ডেন্সি' অর্থাৎ যান্ত্রিক বিকল্পের স্তর এমন ভাবে তৈরি করেছে, যাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ভেঙে গেলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারায় না বিমান। বব স্টোনির মতে, রাডার সম্পূর্ণ হারিয়ে গেলেও এক জন অভিজ্ঞ পাইলট যাতে বিকল্প বাতাসের গতি ও ডানার সমতা ব্যবহার করে উড়ান ধরে রাখতে পারেন, সেই ক্ষমতা বিমানের নকশাতেই ইনবিল্ট থাকে। এই ভারসাম্য রক্ষা প্রযুক্তিই চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মুখে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।জরুরি পরিস্থিতিতে মানবিক বুদ্ধির ব্যবহারফ্লাইদুবাইয়ের এই বিশেষ ঘটনাটিতে ককপিটের ভেতরের নকশাও বড় ভূমিকা নিয়েছে। আক্রমণকারী সহ-চালককে যাত্রীরা কাবু করার পর এক সাধারণ যাত্রী ইয়াগিল হায়ুন বিমানের কন্ট্রোল নিজের হাতে নেন। তিনি পরে জানান, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের বিখ্যাত 'এয়ার ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন' শো দেখে তিনি শিখেছিলেন বিপদে কী করতে হয়! তিনি বিমানের সেন্ট্রাল স্টিক বা 'ইওক' পিছনের দিকে টেনে ধরে সোজা করেন।বোয়িং ৭৩৭ বিমানে ব্যবহৃত জোড়া স্টিয়ারিং ইওক (যা দেখতে অনেকটা বলদের শিংয়ের মতো) অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দিত এবং জরুরি অবস্থায় যে কারও পক্ষে বোঝা কিছুটা সহজ। এয়ারবাসের মতো জয়স্টিক সিস্টেম হলে হয়তো সাধারণ এক জন যাত্রীর পক্ষে পতন ঠেকানো অসম্ভব হতো।অলৌকিক উদ্ধার নাকি প্রযুক্তির বিপ্লব?অতীতে ২০০৯ সালে নিউ ইয়র্কের হাডসন নদীতে এয়ারবাস বিমানের অলৌকিক অবতরণের কথা বিশ্ববাসী জানে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাগ্যের সাহায্য ছাড়া প্রযুক্তি যদি সঙ্গ না দিত, তবে ফ্লাইদুবাইয়ের ক্ষেত্রে নিশ্চিত মৃত্যু নির্ধারিত ছিল। অতীতে একাধিক বিতর্কের মুখে পড়ার পর বোয়িং যেভাবে নিরাপত্তার স্তরে স্তরে আধুনিকতম ইঞ্জিনিয়ারিংকে যুক্ত করেছে, তা আজ বিশ্বের মহাকাশ বিজ্ঞানকে এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে। প্রযুক্তি যখন মৃত্যুর থেকেও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন ইতিহাসের পাতায় লেখা হয় এই ধরনের অসম্ভব বেঁচে ফেরার গল্প।

Boeing 737: নকশার জেরেই নাকানিচোবানি থেকে রক্ষা! কী ভাবে অলৌকিক প্রাণরক্ষা বোয়িংয়ের?