Angry Young Man: অমিতাভ-পরবর্তী যুগের শেষ ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’-এর বিদায়, নানা-প্রয়াণে মায়ানগরীতে কালমেঘ
মুম্বই: সাতের দশকে ভারতীয় সেলুলয়েডে যে প্রতিবাদী চেতনার জন্ম দিয়েছিলেন অমিতাভ বচ্চন, আটের দশকের শেষলগ্নে এসে সেই চেনা ছক ভেঙে তাতেই একদম নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন নানা পাটেকর। পর্দা কাঁপানো ডায়ালগ ডেলিভারি, চোখের প্রখর তেজ আর আপসহীন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া একক উপস্থিতি, রূপোলি পর্দায় তিনি ছিলেন অমিতাভ-পরবর্তী যুগের সবচেয়ে সার্থক এবং মৌলিক ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’। বৃহস্পতিবার সাতসকালে সেই প্রদীপেরই আকস্মিক নির্বাপণ ঘটল। গোয়ার বাসভবনে প্রবীণ অভিনেতার অকালপ্রয়াণের দুঃসংবাদে স্তব্ধ মায়ানগরী। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে থেকেও যিনি ছিলেন মনেপ্রাণে জাতীয়তাবাদী এবং একই সঙ্গে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কাছের মানুষ, সেই স্পষ্টবক্তা অভিনেতার বিদায়ে চিরতরে মুছে গেল এক স্বতন্ত্র ঘরানা। মহারাষ্ট্র সরকার ইতিমধ্যেই তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষবিদায় জানানোর কথা ঘোষণা করেছে।বৃহস্পতিবার সকালে গোয়ার বাসভবনে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পাওয়া যায় নানা পাটেকরকে। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকদের দীর্ঘ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। অথচ চার দিন আগেও গোয়ার এক সামাজিক অনুষ্ঠানে স্বাভাবিক ছন্দেই উপস্থিত ছিলেন তিনি। এই আকস্মিক আঘাত কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তাঁর সতীর্থ ও অনুরাগীরা। সাতের দশকে থিয়েটারের মঞ্চ থেকে শুরু হয়েছিল নানা পাটেকরের অভিনয়যাত্রা। সেই নাট্যচেতনার শিকড়ই তাঁকে সারাজীবন সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবন ও গোষ্ঠীজীবনের প্রতি দায়বদ্ধ করে রেখেছিল। নিরন্ন, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো থেকে কৃষকদের সহায়তায় তাঁর সামাজিক ভূমিকা এক ব্যতিক্রমী মানসিকতার পরিচয় দেয়। মনেপ্রাণে মারাঠা সত্ত্বাকে ভালোবাসা এবং নিজের নীতিতে অটল থাকা নানা ছিলেন ভারতীয় সিনেমায় সত্যিকারের এক সাধারণ মানুষের ‘নায়ক’। ২০১৪ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র পক্ষ থেকে নির্বাচনে লড়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির মোহে না পা বাড়িয়ে তা পত্রপাঠ নাকচ করে দিয়েছিলেন তিনি।নানা পাটেকরের আকস্মিক প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। শোকবার্তায় তিনি লেখেন, “নানা পাটেকর এমন সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন যা মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী স্থান করে নেবে। সমাজসেবায় তাঁর নিষ্ঠা এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ তাঁর ব্যক্তিত্বে প্রতিফলিত হত।” শোকস্তব্ধ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও তাঁর দীর্ঘ শোকবার্তায় অভিনেতার স্বতন্ত্রতার কথা স্মরণ করে জানান, “ভারতীয় চলচ্চিত্রে নানা পাটেকরজি’র মতো তীব্রতা, স্বাতন্ত্র্য এবং অনন্য উপস্থিতির অধিকারী অভিনেতার সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। প্রতিটি চরিত্রে তিনি অসাধারণ বৈচিত্র্য ও সৃজনশীলতার ছাপ রেখেছেন। হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান অপরিসীম। যা বিশ্বাস করতেন, তা বলতে তিনি কখনও পিছপা হননি।”পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও ভারতীয় সিনেমার এই অপূরণীয় ক্ষতিতে গভীর শোক ব্যক্ত করে লিখেছেন, “ভারতীয় সিনেমা তার অন্যতম শক্তিশালী, সৎ এবং স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরকে হারাল। তিনি শুধু পর্দায় অভিনয় করতেন না, চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে তুলে ধরতেন আপসহীন বাস্তবতাকে। ‘পরিিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘প্রহার’ থেকে ‘আব তক ছাপ্পান’, তাঁর অভিনয়শৈলী এমন এক মানদণ্ড তৈরি করেছিল, যা স্পর্শ করা বিরল।”‘পরিন্দা’র বিধ্বংসী খলনায়ক হোক কিংবা ‘ক্রান্তিবীর’-এর সেই কালজয়ী প্রতিবাদী যুবকের গর্জন, প্রতিটি সংলাপে যিনি সিস্টেমের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলতেন, তাঁর প্রয়াণে বলিউড সত্যিই হারাল শেষ ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’কে। অমিতাভ-পরবর্তী যুগে ভারতীয় সিনেমায় এমন সততা ও প্রতিবাদের তীব্রতা নিয়ে আর কেউ দাঁড়িয়েছেন কিনা, তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলবে। কিন্তু বাস্তব ও সেলুলয়েডের সীমানা পেরিয়ে আমজনতার যে নায়ক চলে গেলেন, তাঁর শূন্যতা অপূরণীয়।