Virat Kohli : বিশ্বকাপের আগেই সচিনকে টপকে ১৫ হাজারি মাস্টারক্লাসে কিং কোহলি
তিরুঅনন্তপুরম: কতটা পথ পেরলে তবে ‘কিং কোহলি’ হওয়া যায়? এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আধুনিক ক্রিকেটের তাবৎ ব্যাকরণকে নতুন করে লিখেছেন তিনি। কিন্তু রবিবারের গ্রিনফিল্ড স্টেডিয়াম যেন সাক্ষী থাকল এক অতিপ্রাকৃতিক রূপকথার। মহাকাব্যিক ক্যানভাসে মহাতারকার রাজকীয় প্রত্যাবর্তন! ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে চলতি ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচেই সচিন তেন্ডুলকারকে টপকে দ্রুততম ১৫ হাজারি ক্লাবে পা রাখলেন বিরাট কোহলি। আর এই ঐতিহাসিক মাইলফলকে পৌঁছানোর দিনটিতে শুধুই রেকর্ড গড়েননি, ১৩৯ রানের এক অবিশ্বাস্য, বিধ্বংসী অপরাজিত ইনিংস খেলে দলকে একাই জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিয়েছেন।ম্যাচে নামার আগে সচিনের রেকর্ড ছুঁতে বিরাটের প্রয়োজন ছিল মাত্র ৫৯ রান। ক্রিকেটপ্রেমীদের খুব বেশি অপেক্ষা করাননি দিল্লি বয়। ব্যাট হাতে নামার পর থেকেই ক্যারিবিয়ান বোলারদের ওপর সংহার রূপ ধারণ করেন তিনি। মাত্র ৪৬ বলেই কাঙ্ক্ষিত সেই ৫৯ রানের গণ্ডি পার করে ফেলেন বিরাট। মাস্টার ব্লাস্টার সচিন তেন্ডুলকার যেখানে ৩৭৭টি ইনিংসে ১৫ হাজার রান পূরণ করেছিলেন, সেখানে কোহলি এই অবিশ্বাস্য কাণ্ডটি ঘটিয়ে ফেললেন মাত্র ৩০৩টি ইনিংসে! অর্থাৎ, ক্রিকেটপণ্ডিতদের হিসেব উল্টে দিয়ে এক ধাক্কায় ৭৪টি ইনিংস কম খেলে সচিনের এই বিশ্বরেকর্ড নিজের নামে করে নিলেন ‘কিং’। মাইলফলকে পৌঁছানোর পর দু’ হাত তুলে সচিনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও সমর্থকদের থেকে দাঁড়িয়ে সম্মান গ্রহণ করার সেই মুহূর্ত গ্রিনফিল্ডের গ্যালারিতে এক আবেগঘন আবহাওয়া তৈরি করে।ওয়েস্ট ইন্ডিজের দেওয়া ২৯৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারতের শুরুটা ভালই হয়েছিল। রোহিত শর্মা (৩২) ফিরে যাওয়ার পর ক্রিজে নামেন বিরাট। এরপর শুভমন গিলকে (১১০) সঙ্গী করে শুরু হয় বিরাটের সেই চেনা রূপ, ‘রান চেজ মাস্টার’ অ্যাভাটার। উইকেটের চারপাশে চার-ছক্কার ফুলঝুরি ছড়িয়ে মাত্র ৭৪ বলে নিজের ৫৫তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ৮৬তম শতরান পূর্ণ করেন তিনি। বিরাটের ১৩৯ রান (১০টি চার ও ৯টি বিশাল ছক্কা) এবং গিলের সঙ্গে দ্বিতীয় উইকেটে ১৫০ রানের জুটির সৌজন্যে মাত্র ৪১.৪ ওভারেই ২ উইকেটে ৩০০ রান তুলে ম্যাচ পকেটে পুরে নেয় ভারত। ওয়েস্ট ইন্ডিজের জাস্টিন গ্রিভসের শতরান (১০১) আর কুলদীপ যাদবের ৪ উইকেটের দাপট, সবই ঢাকা পড়ে গেল বিরাট-ঝড়ে।তবে মাঠের ভেতরের এই আগ্রাসনের ঠিক উল্টো পিঠ দেখা গেল মাঠের বাইরে, ম্যাচ শেষের সাক্ষাৎকারে। সাফল্য যখন পায়ের তলায়, তখনও মাটিতে পা রেখে বিরাট যেন শুনিয়ে গেলেন তাঁর ‘মহাভারত’। কতটা পথ পেরলে একজন সাধারণ ছেলে কিং কোহলি হয়ে উঠতে পারে, সেই দর্শনের কথা বলতে গিয়ে ব্যাকুল শোনাল তাঁকে। বিরাটের কথায়, “আমি শুধু প্রতিদিনের কাছে কৃতজ্ঞ। ছোটবেলায় যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, দেশের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়ে সেটাই তো সত্যি হয়েছে। ভারতের হয়ে হয়তো কোনওদিন খেলতেই পারতাম না। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা সেই সুযোগ দিয়েছেন, মানুষের ভালোবাসা দিয়েছেন। মাঝেমধ্যে আমরা কোথা থেকে উঠে এসেছি, সেই অতীতটা ভুলে যাওয়া খুব সহজ। কিন্তু নিজেকে ধরে রাখতে গেলে সেই মূলটা ভুললে চলবে না।”ওয়ানডে ক্রিকেটে গত ১১টি ইনিংসে ৪টি শতরান ও ৫টি অর্ধশতরান করা এই ব্যাটারের কাছে ধারাবাহিকতার রহস্যটা স্রেফ মানসিক। স্পষ্ট বললেন, “লড়াইটা আসলে মনের ভেতরে। অতিরিক্ত অনুশীলন নয়, মানসিক তরতাজা ভাব আর ম্যাচটা বুঝতে পারাটাই আসল। আগামী বিশ্বকাপ পর্যন্ত নিজেকে এই ফরম্যাটে উজার করে দিতে চাই। নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছি, ইতিবাচক খেলব, কিন্তু কখনও বেপরোয়া বা দায়িত্বজ্ঞানহীন হব না।”নিজের শিকড়কে না ভুলে, অহংকারকে দূরে সরিয়ে রেখে মাঠের ভেতর এমন তাণ্ডব আর মাঠের বাইরে এতখানি বিনম্রতা, বোধহয় ঠিক এই কারণেই তিনি শুধুই একজন ক্রিকেটার নন, তিনি ‘কিং কোহলি’। আসন্ন বিশ্বকাপের আগে সচিনকে টপকে বিরাটের এই ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলা নিঃসন্দেহে ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থেকে গেল।