জগন্নাথদেবের হাত-কান দুই-ই আছে! পুরী বা মাহেশ নয়, বাংলার এই রথের আশ্চর্য রহস্য জানলে চমকে উঠবেন
হুগলি ও মেদিনীপুর: রথের দড়ি ধরে কচিকাঁচাদের ছুটে চলা, মেলায় নাগরদোলার ঘূর্ণি আর গরম জিলিপির চেনা গন্ধ— সময় যতই বদলাক, আষাঢ় এলেই বাংলার ঘরে ঘরে আজও এই একই ছবি ফিরে আসে। বাংলার রথযাত্রা বলতেই সবার আগে হুগলির ৬৩০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী মাহেশের রথের নাম মাথায় এলেও, এর বাইরেও বাংলার বুকে ছড়িয়ে রয়েছে এমন কিছু শতাব্দীপ্রাচীন রথযাত্রা, যাদের ইতিহাস ও রীতিনীতি রীতিমতো চোখ কপালে তোলার মতো। কোথাও রাজকীয় জাঁকজমক, কোথাও আবার বিগ্রহের অলৌকিক রূপের গল্প আজও আপামর মানুষকে বিস্মিত করে।[TECHTARANGA-POST:10992]এই তালিকায় প্রথমেই আসে হুগলির গুপ্তিপাড়ার রথ। ১৭৪০ সালে স্বামী পীতাম্বরানন্দের হাত ধরে শুরু হওয়া এই রথযাত্রার সবচেয়ে বড় বিস্ময় লুকিয়ে রয়েছে খোদ জগন্নাথদেবের মূর্তিতে। সাধারণত জগন্নাথদেবের হাত বা কান থাকে না, কিন্তু গুপ্তিপাড়ায় তাঁর হাত এবং কান দুই-ই বর্তমান। ভক্তদের বিশ্বাস, প্রভু এখানে হাত বাড়িয়ে সবাইকে আশীর্বাদ করেন এবং কান পেতে ভক্তদের সব আকুতি শোনেন। শুধু তাই নয়, এখানকার উল্টো রথের আগের দিনের ‘ভাণ্ডার লুট’ প্রথাও বেশ অদ্ভুত। কথিত আছে, জগন্নাথদেব মাসির বাড়ি থেকে না ফেরায় চিন্তিত লক্ষ্মী দেবী বৃন্দাবনচন্দ্র ও কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে নালিশ জানান এবং তাঁরা লেঠেল পাঠিয়ে মাসির বাড়ির ভাণ্ডার লুট করান। সেই ঐতিহাসিক রীতি মেনে আজও এখানে হাজার হাজার মানুষ ভোগ লুটে অংশ নেন।রথের দড়িতে টান বহরমপুরের বিজেপি বিধায়ক সুব্রত মৈত্রেরঅন্য এক অনন্য ঐতিহ্যের সাক্ষী দিতে আমাদের যেতে হবে পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদলে। ১৭৭৬ সালে রানী জানকী দেবী এই রথযাত্রার সূচনা করেছিলেন। মহিষাদলের রাজবাড়ির এই কাঠের রথটি যেন এক চলমান প্রাসাদ, যা প্রায় ৭৫ ফুট উঁচু এবং ৩৬টি বিশাল চাকার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। একসময় কামানের গর্জন আর হাতি-ঘোড়ার মিছিলে এই রথ চললেও, এখন ফটকার শব্দে ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। তবে এই রথের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে স্বয়ং জগন্নাথ নন, বরং রথে চড়ে মাসির বাড়ি যান রাজপরিবারের কুলদেবতা গোপালজিউ, যা বাংলার অন্য কোথাও দেখা যায় না।[TECHTARANGA-POST:10958]এর পাশাপাশি উত্তর ২৪ পরগনার আতপুরের রথবাড়ির ইতিহাসও কম আকর্ষণীয় নয়। ১৭৯৮ সালে ঘোষ পরিবারের কাশীনাথ ঘোষ নিজের বাড়ির নিমগাছ কেটে বিগ্রহ ও কাঠের রথ তৈরি করিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে এলাকার প্রধান উৎসবে পরিণত হয়। এই রথবাড়ির প্রাঙ্গণে একসময় পা রেখেছেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বা হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতো মণীষীরা। মাহেশ, মহিষাদল, গুপ্তিপাড়া কিংবা আতপুর— প্রতিটি রথের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও, শত শত বছর ধরে এগুলি কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস ও মিলনের এক মহা-উৎসবে পরিণত হয়েছে।