কলকাতা থেকে 'প্যাকআপ' আই-প্যাকের, পাততাড়ি গুটিয়ে দক্ষিণের পথে পরামর্শদাতারা!
কলকাতা: ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের ধাক্কায় ওলটপালট হয়ে গেল পূর্বতন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের পলিটিক্যাল ব্যাকস্টেজ ম্যানেজমেন্ট। ভোট মেটার আগেই যে অফিসে তালা পড়েছিল, এবার কলকাতা থেকে পাকাপাকিভাবে পাততাড়ি গোটাল সেই ভোটকুশলী সংস্থা আই-প্যাক (I-PAC)। তিলোত্তমার মাটি থেকে কার্যত অবসান ঘটল এক দশকের কর্পোরেট রাজনীতির অধ্যায়ের।[TECHTARANGA-POST:9490]ভোটের মাঝপথেই সল্টলেকের আই-প্যাক অফিসে আচমকা তালা ঝুলিয়ে কর্মীদের ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, সেই অফিস আর খোলেনি। উলটে জানা যাচ্ছে, অফিস বন্ধ থাকা অবস্থাতেই কলকাতার বহু কর্মীকে ছাঁটাইয়ের নোটিশ ধরিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সংস্থায় তাঁদের আর প্রয়োজন নেই। আর বাকি যে কয়েকজন কর্মী অবশিষ্ট রয়েছেন, তাঁদের তড়িঘড়ি দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন প্রজেক্টে বদলি করে দেওয়া হচ্ছে।[TECHTARANGA-POST:9480]আই-প্যাকের এই ডেরা তোলার আবহের মধ্যেই সোমবার তৃণমূলের অন্দরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেন বারুদ হয়ে ফেটে পড়েছে। পরাজয়ের ‘নৈতিক দায়’ নিয়ে দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সির কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন বর্ষীয়ান সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। চিঠিতে পরাজয়ের দায় নেওয়ার কথা বলা হলেও, তাঁর আসল নিশানা যে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এই ভোটকুশলী সংস্থা, তা রাজনীতির কারবারিদের কাছে জলের মতো পরিষ্কার। চিঠিতে নজিরবিহীন আক্রমণ শানিয়ে কাকলি স্পষ্ট লিখেছেন, “ভুঁইফোঁড় সংস্থা দিয়ে কঠিন কাজ হয় না।”[TECHTARANGA-POST:9469]উনিশের লোকসভা নির্বাচনে বাংলায় বিজেপি ১৮টি আসন পেয়ে মাথা তোলার পর, ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোরের (PK) শরণাপন্ন হয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে আই-প্যাকের হাত ধরে তৃণমূল বৈতরণী পার হতেই যেন এক অদ্ভূত মায়ায় পড়ে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পিকে বা আই-প্যাককে বিদায় দেওয়া তো দূর, দলের অন্দরেই তাঁদের স্থায়ী জায়গা করে দেওয়া হয়। মমতা-অভিষেকের পর তৃণমূলে কার্যত ‘থার্ড পাওয়ার সেন্টার’ বা তৃতীয় শক্তি হয়ে উঠেছিলেন প্রথমে পিকে এবং পরবর্তীতে প্রতীক জৈন। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে আই-প্যাকের নবীন কর্মীরা জেলা ও ব্লক সভাপতি তো বটেই, খোদ দলের প্রবীণ মন্ত্রীদেরও ধমকাতে-চমকাতে শুরু করেছিলেন বলে অভিযোগ![TECHTARANGA-POST:9447]কালীঘাটের ঘনিষ্ঠ এক প্রবীণ নেতার কথায়, “বাংলায় তৃণমূল সমর্থকদের কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানেই ছিল একটা আবেগ। তৃণমূল দলটাই চলত সেই আবেগের ওপর ভর করে। আই-প্যাক সেই আবেগকে সরিয়ে দলটাকে যন্ত্র দিয়ে চালাতে চেয়েছিল। যে রাজনৈতিক সমীকরণ মুকুল রায় মানুষের পালস বুঝে এক লহমায় ধরে ফেলতেন, আই-প্যাকের আইআইটি-আইআইএম-এর ছেলেমেয়েরা তা বুঝতে চেয়েছিল ‘মেশিন লার্নিং’ দিয়ে।” মূলত পেশাদার সংস্থা দিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে দলের স্বাভাবিক সাংগঠনিক কাঠামো বা 'গ্রাসরুট বন্ডিং' যে ক্রমশ ফিকে হয়ে গিয়েছিল, ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই নজিরবিহীন ভরাডুবি তারই প্রমাণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।[TECHTARANGA-POST:9489]আই-প্যাকের সঙ্গে তৃণমূলের এই সুদীর্ঘ ও নিবিড় সম্পর্কের সুতোটা অবশ্য ছিঁড়তে শুরু করেছিল কেন্দ্রীয় এজেন্সির তদন্তের জটেই। গত ৮ জানুয়ারি সল্টলেকের আই-প্যাক দফতর এবং সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক প্রতীক জৈনের বাড়িতে তল্লাশি চালায় ইডি। সেই সময় এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিল কলকাতা। ইডি তল্লাশি চলাকালীন খোদ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্য সরকারের পদস্থ আধিকারিকদের নিয়ে প্রতীকের বাড়িতে হাজির হন। অভিযোগ ওঠে, তল্লাশি চলাকালীনই সেখান থেকে ল্যাপটপ, ফাইল ও নথিপত্র বের করে আনেন তিনি, যা নিয়ে জল গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত।[TECHTARANGA-POST:9487]কফিনে শেষ পেরেকটি পড়ে আই-প্যাকের আরেক প্রতিষ্ঠাতা ভিনেশ চাণ্ডেলের গ্রেফতারিতে। গত ১৩ এপ্রিল, যখন বাংলায় ভোটের দামামা পুরোদমে বাজছে, ঠিক তখনই জিজ্ঞাসাবাদের পর ভিনেশকে গ্রেফতার করে ইডি। প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় জেল হেফাজতে কাটানোর পর, বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ মিটতেই দিল্লির পাটিয়ালা হাউস কোর্ট থেকে জামিন পান ভিনেশ। তবে, এই আই-প্যাক কর্তা আপাতত আইনি স্বস্তি পেলেও, বাংলায় যে কর্পোরেট রাজনীতির দোকানে পাকাপাকিভাবে লালবাতি জ্বলে গেল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।