Mithu Mukherjee: 'মর্জিনা’-য় খ্যাতি, ‘আশ্রিতা’য় কামব্যাক, প্রয়াত মিঠু মুখোপাধ্যায়
বাংলা ছবির এক সময়ের জনপ্রিয় মুখ মিঠু মুখোপাধ্যায় আর নেই। রবিবার রাতে মুম্বইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ হয়েছে তাঁর দীর্ঘ লড়াই। গত এক বছর ধরে ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী। মুম্বইতেই চলছিল চিকিৎসা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অন্তরালেই চিরবিদায় নিলেন সাতের দশকের এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী। মৃত্যুর খবর সামনে আসতেই ফিরে আসছে তাঁর অভিনয়জীবনের সেই সময়টা, যখন বাংলা ছবির পর্দায় জায়গা করে নিচ্ছিলেন একের পর এক নতুন মুখ। সুচিত্রা সেন, মাধবী মুখোপাধ্যায়দের পর বাংলা ছবির নায়িকাদের জগতে তখন বদল আসছে। অপর্ণা সেন, মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় সহ নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীরা নিজেদের জায়গা তৈরি করছিলেন। সেই সময়েই মিঠু মুখোপাধ্যায়ের উত্থান। সৌন্দর্য, অভিনয়ের সাবলীলতা আর পর্দায় সহজাত আকর্ষণ সব মিলিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দর্শকের নজরে চলে আসেন তিনি।১৯৭১ সালে চিত্ত বসুর ‘শেষ পর্ব’ দিয়ে বড়পর্দায় যাত্রা শুরু করেন মিঠু। প্রথম ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন সমিত ভঞ্জ। তবে অভিষেকের ছবিতেই সাফল্যের দরজা খুলে যায়নি। অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও দু’বছর। ১৯৭৩ সালে ‘মর্জিনা আবদুল্লা’য় মর্জিনা চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। এরপর একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ছবি আসতে থাকে। ‘নিশিকন্যা’য় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে অভিনয় করেন মিঠু। ১৯৭৪ সালে ‘মৌচাক’ তাঁকে পৌঁছে দেয় জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। নীপা চরিত্রে তাঁর প্রাণবন্ত অভিনয় এবং রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গে জুটি দর্শকের মনে দাগ কাটে। উত্তমকুমার, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, অনুপকুমার, চিন্ময় রায়ের মতো শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেও নিজের উপস্থিতি আলাদা করে জানান দিয়েছিলেন অভিনেত্রী। ‘মৌচাক’-এর পর রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গে ফের জুটি বাঁধেন ‘স্বয়ংসিদ্ধা’য়। ‘কবি’, ‘চাঁদের কাছাকাছি’, ‘হোটেল স্নো ফক্স’-এর মতো ছবিতেও অভিনয় করেন তিনি। তাঁর সৌন্দর্য নিয়েও সেই সময় যথেষ্ট আলোচনা ছিল। তবে মিঠুকে শুধু ‘সুন্দরী নায়িকা’ হিসেবে দেখলে তাঁর অভিনয়জীবনের ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। চরিত্র অনুযায়ী নিজেকে বদলাতে পারতেন তিনি। বাংলার গণ্ডিও পেরিয়েছিলেন মিঠু। ১৯৭৬ সালে ‘খান দোস্ত’ দিয়ে হিন্দি ছবিতে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। শত্রুঘ্ন সিন্হার বিপরীতে অভিনয় করার পাশাপাশি পরে বাসু চট্টোপাধ্যায়ের ‘সফেদ ঝুট’, ‘দিল্লাগি’ এবং ‘দো লড়কে দোনো কড়কে’-তেও কাজ করেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলা এবং হিন্দি দুই ছবির জগতেই তাঁর বেশ পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু জনপ্রিয়তার সেই সময়টা খুব বেশি দীর্ঘ নয়। অভিনয়জীবনের মাঝপথেই ধীরে ধীরে পর্দা থেকে সরে যান মিঠু। একটা সময় পর্যন্ত নিয়মিত কাজ করার পর দীর্ঘ বিরতি নেন। দর্শক যখন তাঁকে প্রায় ভুলতেই বসেছেন, তখনই ১৯৯০ সালে ‘আশ্রিতা’ ছবির হাত ধরে প্রত্যাবর্তন করেন মিঠু।‘আশ্রিতা’ মিঠুর কেরিয়ারে বেশ অন্যরকম একটি অধ্যায়। দীর্ঘ বিরতির পর ফিরে এসে ছবিতে অভিনয় করার পাশাপাশি প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত হন। ছবিটি দর্শকের সাড়া পায় এবং ব্যবসায়িক ভাবেও সফল হয়। কিন্তু এরপরও মিঠু আর নিয়মিত অভিনয়ে ফেরেননি। বরং সেটিই হয়ে রইল তাঁর শেষ ছবি। তার পরের জীবনটাও ছিল অনেকটাই লোকচক্ষুর আড়ালে। বহু বছর ধরে মুম্বইয়ে থাকতেন মিঠু। দক্ষিণ কলকাতার বাড়িও বিক্রি করে দিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বরাবরই খুব বেশি প্রকাশ্যে আসেননি। জনপ্রিয়তার সময়েও যেমন নিজের ব্যক্তিগত জগত আলাদা রেখেছিলেন, পরবর্তী জীবনেও সেই দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন। মৃত্যুর পর তাই মিঠুকে ঘিরে শুধু তাঁর শেষ জীবনের কথাই নয়, ফিরে আসছে সত্তরের দশকের সেই পর্দাটাও। ‘মর্জিনা আবদুল্লা’র মর্জিনা, ‘মৌচাক’-এর নীপা, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ কিংবা দীর্ঘ বিরতির পর ‘আশ্রিতা’ এই কয়েকটি চরিত্রই প্রমাণ করে, অল্প সময়ের অভিনয়জীবনেও কতটা গভীর ছাপ রেখে যাওয়া যায়। আলো থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন মিঠু মুখোপাধ্যায়। কিন্তু বাংলা ছবির পর্দায় যে আলোয় একসময় তাঁকে দেখা গিয়েছিল, সেখান থেকে তাঁর নাম মুছে যায়নি।