নয়াদিল্লি: দেশের ভোটার তালিকা থেকে এক ধাক্কায় কোটি কোটি নাম বাদ দেওয়া এবং তথাকথিত ‘ভোটচুরি’র প্রতিবাদে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে উত্তাল রাজধানী নয়াদিল্লি।
১ নভেম্বর রবিবারের মেগা সমাবেশের আগে শনিবার দিল্লির রাজপথে এক অভিনব ‘পাবলিক ইমপিচমেন্ট’ বা গণ-অভিশংসন কর্মসূচির আয়োজন করল বিরোধী ‘ইন্ডি’ (INDIA) জোট। লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার মীরা কুমারের পরিচালনায় পুরনো সংসদ ভবনের সেন্ট্রাল হলের আদলে তৈরি মঞ্চে দাঁড়িয়ে সিইসি-র বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দেন মল্লিকার্জুন খাড়গে, রাহুল গান্ধী-সহ বিরোধী শিবিরের শীর্ষ নেতৃত্ব।
বিরোধীদের আনা ছয় দফা অভিযোগে অভিযুক্ত জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে বরখাস্ত করে ‘দেশদ্রোহের’ দায়ে বিচার করার দাবি তোলা হয়। এদিকে রবিবারের রামলীলা ময়দানের মহাসমাবেশ ঘিরে ১০ থেকে ১২ লক্ষ মানুষের উপস্থিতির আশঙ্কায় রাজধানী জুড়েই জারি করা হয়েছে কড়া সতর্কতা। রামলীলা ময়দানকে কার্যত ‘চক্রব্যুহে’ মুড়ে ফেলে ২০০টি অত্যাধুনিক এআই (AI) ক্যামেরার সাহায্যে চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারি চালাচ্ছে দিল্লি পুলিশ।
শনিবারের এই প্রতীকী গণ-অভিশংসন অধিবেশনে মল্লিকার্জুন খাড়গে অভিযোগের প্রস্তাব পেশ করে সিইসির বিরুদ্ধে ছয়টি গুরুতর দায়ে সুর চড়ান। এর মধ্যে রয়েছে ১৩.২ কোটি ভোটারের নাম বেআইনিভাবে বাতিল করা, সংসদের অনুমোদন ছাড়াই ফর্ম-৬ পরিবর্তন, ইসিআই-নেট (ECINET)-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা করায়ত্ত করা এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নির্বাচন কমিশন পরিচালনা করা।
খাড়গের সাফ বক্তব্য, ‘‘সংবিধানের ৩২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রাপ্ত সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার আজ চরম হুমকির মুখে। এটি কেবল রাজনৈতিক লড়াই নয়, গণতন্ত্র বাঁচানোর সংগ্রাম।’’ মীরা কুমার অধিবেশন শুরু করে জানান, এশিয়া, আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার যেসব দেশ ভারতের গণতন্ত্রকে মডেল মানত, আজ তাদের সামনে দেশের এই ভাবমূর্তি চরম প্রশ্নের মুখে।
অন্যদিকে বিরোধীদের এই কর্মসূচিকে তীব্র কটাক্ষ করে বিজেপির সর্বভারতীয় মুখপাত্র গুরু প্রকাশ পাসওয়ান বলেন, ‘‘বাস্তবে নির্বাচনে জিততে না পেরে রাহুল গান্ধী নিজের পছন্দের ‘নকল সংসদে’ বসে মনগড়া গল্প ফাঁদছেন। এটি কোনও মক পার্লামেন্ট নয়, বরং গণতন্ত্রেরই চরম উপহাস।’’
এই রাজনৈতিক উত্তাপের আবহেই রবিবার ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে হতে চলেছে বিরোধী জোটের এযাবৎকালের সর্ববৃহৎ জমায়েত। কর্মসূচিতে অংশ নিতে ইতোমধ্যেই দিল্লিতে পৌঁছে গিয়েছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
আরও পড়ুন: বেবি-আন্টির ভালবাসা! গড়বেতায় তোপ শুভেন্দুর, খুলছে ছোট আঙারিয়া ফাইল
এ ছাড়া কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব এবং সমাজকর্মী ও আইসা (AISA)-র সর্বভারতীয় সভানেত্রী নেহা বোরা এবং নবগঠিত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রতিনিধিরা একযোগে মঞ্চে উপস্থিত থাকবেন। তবে আম আদমি পার্টি (AAP) এই কর্মসূচিতে স্বতন্ত্র সমর্থন জানালেও জোটে সরাসরি অংশ না নেওয়ার কথা আগেই পুনর্ব্যক্ত করেছে।
রবিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত রামলীলা ময়দানের এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে অচলাবস্থার আশঙ্কা করছে প্রশাসন। মধ্য দিল্লিজুড়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে বিশেষ কৌশল গ্রহণ করেছে ট্রাফিক পুলিশ। বাহাদুর শাহ জাফর মার্গ, রাজঘাট, দিল্লি গেট, আইটিও, রঞ্জিত সিং ফ্লাইওভার এবং মিন্টো রোডের মতো গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলিতে রুট পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিপুল ভিড় সামলাতে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ১৪টি বিশেষ জোনে বিভক্ত করা হয়েছে এলাকাটি।
ইতিমধ্যেই অবশ্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পাল্টা তোপ দেগে রাহুল গান্ধী ও অখিলেশ যাদবকে সংসদে বিশেষ অধিবেশন ডেকে মুখোমুখি আলোচনার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। শাহের বক্তব্য, ‘‘নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে সরকারের কিছু লুকোনোর নেই।
কিন্তু বিরোধীরা সংসদে আলোচনা এড়িয়ে বাইরে বিভ্রান্তি ছড়াতেই বেশি আগ্রহী।’’ তবুও, রবিবার রামলীলা ময়দানে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি এবং বিরোধীদের এই একাট্টা অবস্থান যে দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে বড়সড় ধাক্কা দিতে চলেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত রাজনৈতিক মহল।
Leave a comment