কলকাতা: সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলস বা শর্টস স্ক্রোল করলেই যার মুখের হাসি আর পকেট পরোটার ভাজ গিলে নেওয়ার দৃশ্য আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু, সেই শিয়ালদহের বিখ্যাত ‘ভাইরাল পরোটা বিক্রেতা’ রাজুদার দোকানে এবার সোজা খাদ্য সুরক্ষা দফতর ও পুরসভার কড়া নজরদারি। শনিবার সকালে এনআরএস হাসপাতালের ঠিক সামনের ফুটপাতে রাজুর জনপ্রিয় পকেট পরোটার দোকানে আচমকাই হানা দেন খাদ্য নিরাপত্তা আধিকারিকরা। পরিচ্ছন্নতা ও বৈধ নথিপত্র খতিয়ে দেখতে চালানো হয় এই আকস্মিক তল্লাশি অভিযান। শুধু রাজুদার দোকানই নয়, এদিন শিয়ালদহ স্টেশন চত্বর ও সংলগ্ন এলাকার একাধিক খাবারের দোকানেও হানা দেয় খাদ্য সুরক্ষা দফতর। অস্বাস্থ্যকর ও বাসি খাবার বিক্রির অভিযোগে এ দিন স্টেশন চত্বর থেকে বাজেয়াপ্ত করা হয় প্রচুর পরিমাণে পচা খাবার, যা শহরের পথচলতি মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার দিক থেকে ফের এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিল।
শনিবার সকালে আচমকা শিয়ালদহ স্টেশন ও এনআরএস হাসপাতাল চত্বরে এই মেগা অভিযান চালায় খাদ্য সুরক্ষা দফতরের বিশেষ দল। স্টেশনের আশপাশের বিভিন্ন ফাস্টফুড ও ভাতের হোটেলের খাবারের গুণগত মান যাচাই করতে স্পটেই রাসায়নিক মিশিয়ে পরীক্ষা করা হয় সিঙারা, কচুরির তরকারি, মাছ এবং মাংসের মতো পদগুলি। রাসায়নিক রিয়্যাকশনের মাধ্যমে খাবারের ক্ষতিকর দিক ও গুণগত মান হাতেনাতে ধরে ফেলেন আধিকারিকরা। পরীক্ষার পরেই দেখা যায়, বহু দোকানই ক্রেতাদের হাতে তুলে দিচ্ছে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ বাসি খাবার। এরপরই কড়া পদক্ষেপ করে সেই সমস্ত পচা খাবার নষ্ট করে দেওয়া হয়। তল্লাশিতে মোট ১০০টি সিঙারা, কচুরির ডাল, বাসি তরকারি, পচা চিকেন এবং মাছের ডিম বাজেয়াপ্ত করে মাটিতে ফেলে নষ্ট করা হয়। আধিকারিকদের স্পষ্ট বার্তা, জনস্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেললে কোনওভাবেই রেয়াত করা হবে না, এবং সমস্ত দোকানদারকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।
এই সামগ্রিক অভিযানের মাঝেই সবচেয়ে বড় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল শিয়ালদহ ফ্লাইওভারের নীচে বা এনআরএস হাসপাতালের সামনে বসা ভাইরাল পরোটা বিক্রেতা রাজুদার দোকান। আধিকারিকরা তাঁর দোকানে পৌঁছে প্রথমেই পরোটা বিক্রির বৈধ লাইসেন্স বা ফুড সেফটি রেজিস্ট্রেশনপত্র দেখতে চান। কিন্তু তা দেখাতে ব্যর্থ হন রাজুদা। লাইসেন্স না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে রাজুদা সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘‘লাইসেন্স বা এই সংক্রান্ত নিয়মকানুন সম্পর্কে আমার কোনও ধারণাই ছিল না। বাড়ি থেকে ১০-১২ কেজি ময়দার পরোটা মেখে বানিয়ে প্রতিদিন ভোরবেলার ৩টে ৪৫ মিনিটের ট্রেন ধরে কলকাতায় আসি এবং এই ফুটপাতেই বিক্রি করি। সকাল ১১টার মধ্যে আবার বাড়ি ফিরে যাই। আজ স্যারেরা এসে লাইসেন্সের কথা বলেছেন। আমি এবার দ্রুত লাইসেন্স নেওয়ার চেষ্টা করব। তবে আমার খাবারের মান ও সততা নিয়ে কেউ কোনও দিন কোনও আপত্তি তুলতে পারবে না।’’
লাইসেন্স না থাকলেও রাজুদার তৈরি তরকারির প্রাথমিক ‘ফ্লোর টেস্ট’ বা গুণগত মান যাচাইয়ে তা পাশ করেছে বলে আধিকারিকরা জানিয়েছেন। তবে নিখুঁত বিশ্লেষণের জন্য তাঁর খাবারের নমুনা ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে এবং আগামী ৭ দিনের মধ্যে তার রিপোর্ট হাতে আসবে। এছাড়া পরিচ্ছন্নতার অভাব নিয়ে রাজুদাকে বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়ে খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিকরা তাঁকে অবিলম্বে রান্নার সময় ও পরিবেশনের সময় সার্জিক্যাল ক্যাপ এবং হ্যান্ড গ্লাভস পরার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। রাজুদাও সেই নির্দেশ হাসিমুখে মাথা পেতে গ্রহণ করে জানিয়েছেন, খদ্দেরদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে এবার থেকে তিনি নিয়ম মেনেই টুপি ও গ্লাভস পরে পরোটা ভাজবেন।
সোশ্যাল মিডিয়ার গ্ল্যামার আর ভাইরাল হওয়ার লাইমলাইটে থাকা রাজুদার কপালে এদিনের এই পুরসভার কড়া হানা এক দারুণ শিক্ষা নিয়ে এল। একদিকে যখন স্টেশন চত্বরের অন্যান্য অসাধু ব্যবসায়ীদের বাসি খাবার বাজেয়াপ্ত করে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে রাজুদার মতো জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড বিক্রেতারাও এবার সরকারি নিয়মবিধি ও শংসাপত্রের আওতায় আসতে বাধ্য হচ্ছেন। পথচলতি হাজার হাজার সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতাকে সুনিশ্চিত করতে প্রশাসনের এই জিরো টলারেন্স নীতি যে অত্যন্ত সময়োপযোগী, তা বলাই বাহুল্য।
Leave a comment