কলকাতা: দুর্গাপুজোর পাস বিক্রি ও সরকারি টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার নামে শত শত কোটি টাকার আর্থিক দুর্নীতির জাল ছড়ানোর অভিযোগে আরও এক মাথাব্যথা বাড়ল প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের। ইউনেস্কোর নাম ভাঁড়িয়ে ভুয়ো পাস বিক্রি ও সরকারি তহবিলে নয়ছয়ের মামলায় এবার ‘মাস আর্ট’ সংস্থার সচিব তথা মূল অভিযুক্ত ধ্রুবজ্যোতি বসু ওরফে শুভকে গ্রেফতার করল কলকাতা পুলিশের স্পেশ্যাল ইনভেস্টিগেশন টিম (সিট)।
বুধবার সন্ধ্যায় মধ্য কলকাতার টেরিটি বাজার ও পোদ্দার কোর্ট চত্বর এলাকা থেকে তাঁকে পাকড়াও করা হয়। এর আগে এই মামলায় রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা দাপুটে তৃণমূল নেতা ইন্দ্রনীল সেনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। এবার সেই হাই-প্রোফাইল মামলায় দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তি হিসেবে ধ্রুবজ্যোতির এই গ্রেফতারি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
আরও পড়ুন: “টাকা তুলতে বারণ করেছিলাম!” লালবাজারে গোয়েন্দাদের সামনেই কাদা ছোড়াছুড়ি ইন্দ্রনীল ও তাঁর স্ত্রীর!
মাস আর্ট থেকে টেন্ডার রাজ: দুর্নীতির গভীরে সিট
তদন্তে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর অধরা স্বীকৃতি পাওয়ার পরপরই গড়ে উঠেছিল ‘মাস আর্ট’ নামক সংস্থাটি। পুলিশ সূত্রে খবর, এই সংস্থাটি পুরোপুরিভাবে ধ্রুবজ্যোতি বসু এবং ইন্দ্রনীল সেনের মস্তিষ্কপ্রসূত।
সংস্থার মাথায় ছিলেন খোদ প্রাক্তন মন্ত্রীর স্ত্রী মধুছন্দা সেন। যদিও তিনি কলকাতা হাইকোর্ট থেকে আগাম রক্ষাকবচ পেয়েছেন, তবুও তাঁকে একাধিকবার লালবাজারে ডেকে ম্যারাথন জেরা করা হয়েছে। সম্প্রতি লালবাজারে ইন্দ্রনীল সেন এবং মধুছন্দা সেনকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করেন তদন্তকারীরা। সূত্রের খবর, সেই জেরা চলাকালীন স্বামী-স্ত্রীর তীব্র বচসা ও মতানৈক্য প্রকাশ্যে আসে। একে অপরকে কাঠগড়ায় তুলে মধুছন্দা দাবি করেন যে তিনি বারবার বারণ করা সত্ত্বেও ইন্দ্রনীল শোনেননি, অন্যদিকে ইন্দ্রনীলের দাবি, তাঁর স্ত্রী এই দুর্নীতির সমস্তটাই জানতেন।
এদিকে, মাস আর্টের সেক্রেটরি ধ্রুবজ্যোতি এতদিন পলাতক ছিলেন এবং সম্প্রতি উচ্চ আদালতে তাঁর আগাম জামিনের আবেদনও খারিজ হয়ে যায়। এফআইআরে নাম থাকা ও আইনি পথ বন্ধ হওয়ার পরেই তাঁকে জালে তোলে লালবাজার।
পুলিশ জানিয়েছে, মাস আর্ট ছাড়াও ‘গিডি ক্রিয়েশন’, ‘থার্ড আই ক্রিয়েশন’ এবং ‘রূপকার’ নামের কয়েকটি সংস্থার মাধ্যমে গত পাঁচ বছরে পর্যটন দফতরের প্রায় ১৫০টিরও বেশি টেন্ডার পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।
দিঘার জগন্নাথদেবের মন্দিরের প্রসাদ বিতরণ থেকে শুরু করে অমিতাভ বচ্চনের জন্মদিন পালন, রোড শো, বইমেলা, গানমেলা বা রেড রোডের কার্নিভাল, প্রতিটি ক্ষেত্রেই পছন্দের ঘনিষ্ঠ ও আত্মীয়দের সংস্থাকে মোটা অঙ্কের টেন্ডারের বরাত দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে প্রায় ৩০০ কোটি টাকারও বেশি দুর্নীতির হদিশ মিলেছে।
পরিবারের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কাটমানির পাহাড়
তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা অবাক হয়েছেন টাকার লেনদেনের জাল দেখে। জানা গিয়েছে, মেলা ও উৎসবের ইভেন্টের নামে ভুয়ো বিল তৈরি করে বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার কাটমানি সোজা ঢুকেছে প্রাক্তন মন্ত্রী এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। গিডি ক্রিয়েশন থেকে সরাসরি ইন্দ্রনীলের অ্যাকাউন্টে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা এবং তাঁর মেয়ের অ্যাকাউন্টে ২২ লাখ ৪৭ হাজার টাকা গিয়েছে বলে তথ্য মিলেছে। এমনকি প্রায় ২০টি পৃথক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এই কালো টাকা নয়ছয় করা হয়েছে।
এদিকে, লালবাজারের সমন এড়িয়ে চলায় আরও কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রীর কন্যা আভেরি সেন। মঙ্গলবার অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি হাজিরা এড়ালেও পুলিশ সূত্রে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, দ্বিতীয় নোটিসে সাড়া না দিলে তাঁর বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ এমনকি গ্রেফতারিও হতে পারে।
ইতিমধ্যেই এই দুর্নীতিতে ধৃতদের বয়ানের ভিত্তিতে আদালতে গোপন জবানবন্দি নথিভুক্ত করিয়েছে পুলিশ। পুরো ঘটনাটি নিয়ে রাজ্যের বিরোধী শিবিরও সোচ্চার হয়েছে। সব মিলিয়ে, পুজোর পাস বিতর্ক থেকে শুরু করে সরকারি কোষাগার লুটের এই সাঁড়াশি অভিযানে আগামী দিনে আরও কত রাঘববোয়াল জালে পড়েন, সেটাই এখন দেখার।
Leave a comment