কলকাতা: আশঙ্কাই সত্য়ি হতে চলেছে।
জনগণনার জেরে ২০২৭ সালের মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পিছিয়ে যেতে চলেছে। বুধবার বিকাশ ভবনে এক সাংবাদিক বৈঠকে এ কথা স্পষ্ট করে জানান স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন। দিল্লির সেন্সাস বোর্ডের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত জনগণনার কাজ চলার কথা। এই কাজে বহু শিক্ষক-শিক্ষিকাকে দায়িত্ব পালন করতে হবে বলেই পরীক্ষার সূচিতে এই পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
আরও এখানেই প্রশ্ন রাজ্য়ের শিক্ষকদের একাংশের। তাঁদের প্রশ্ন, অতীতেও রাজ্যে জনগণনার কাজ হয়েছে। তখনও সময়েই পরীক্ষা হয়েছে। তাহলে এবার কী হল যে মাধ্য়মিক ও উচ্চমাধ্যমিক মত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারল না সরকার? এই প্রশ্নের অবশ্য কোনও জবাব স্কুল শিক্ষামন্ত্রী দিতে পারেননি। তিনি জানিয়েছেন, পাঠ্যক্রম ও সিলেবাস সংক্রান্ত একাধিক যুগান্তকারী পরিবর্তন হচ্ছে।
কেন পিছোচ্ছে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক?
পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী ২০২৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকেই জনগণনার দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা চলবে ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত।
এর ফলে ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষা নিলে মারাত্মক শিক্ষকসঙ্কট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত ২ নভেম্বর মধ্যশিক্ষা পর্ষদ পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব পাঠায় শিক্ষা দফতরে। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই এ দিন স্কুলশিক্ষামন্ত্রী জানান, মাধ্যমিক পরীক্ষা পিছোচ্ছে এবং তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাও রি-সিডিউল বা পুনর্নির্ধারণ করা হবে।
যদিও প্রস্তাবিত নতুন সূচি অনুযায়ী ২ মার্চ থেকে মাধ্যমিক শুরু হওয়ার কথা ভাবা হয়েছে, তবে ৫ মার্চ পর্যন্ত জনগণনার সংশোধিত তালিকার কাজ চলার কথা থাকায় শিক্ষকসঙ্কট নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
অন্যদিকে, মার্চ মাসের শেষে উচ্চমাধ্যমিক শুরু হলে তা এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত গড়াতে পারে। ফলে সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসতে পড়ুয়াদের কোনও সমস্যা হবে কি না, তা নিয়ে অভিভাবকদের মনে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে সমস্ত আশঙ্কার জল ঢেলে শিক্ষামন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন যে, সর্বভারতীয় পরীক্ষা এবং তার ফলপ্রকাশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিকের কোনও সংঘাত ঘটবে না। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে চূড়ান্ত পরিবর্তিত সূচি প্রকাশ করা হবে।
পাঠ্যবই ও সিলেবাসে বড় বদল
পরীক্ষা পিছোনোর পাশাপাশি পাঠ্যক্রমের সংস্কার নিয়েও বড় পদক্ষেপ করেছে শিক্ষা দফতর। এ দিন মন্ত্রী ঘোষণা করেন, এখন থেকে সমস্ত পাঠ্যবইয়ের শুরুতেই থাকবে সম্পূর্ণ ‘বন্দে মাতরম্’ গানটি। সংবিধানের প্রস্তাবনার ঠিক পরের পাতাতেই যুক্ত করা হচ্ছে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও কর্তব্য, এবং তার পরবর্তী পাতাতেই থাকবে বন্দে মাতরম্।
পাশাপাশি, পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) পাঠ্যের জন্য এতদিন নির্দিষ্ট কোনও বই বা পরিকাঠামো ছিল না। এ বার সেই অভাব দূর করে ওই চার শ্রেণির জন্য নতুন বই প্রকাশ করা হয়েছে এবং এখন থেকে এই বিষয়ে নিয়মিত পরীক্ষাও নেওয়া হবে।
এই আধুনিক পাঠ্যবইগুলিতে কোডিং, রোবটিক্স এবং পাইথন-এর মতো বর্তমান যুগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগোপযোগী বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে তৃতীয় ভাষা হিসেবে হিন্দি, আরবি এবং সংস্কৃত পড়ানোর জন্য নতুন বই বাজারে আসছে, যা এতদিন নির্দিষ্ট পাঠ্যপুস্তকের অভাবে কিছুটা পিছিয়ে ছিল।
ইতিহাস ও সাম্প্রতিক বিতর্ক নিয়ে কড়া বার্তা
পাঠ্যক্রমে রাজনৈতিক সংযোজন ও সাম্প্রতিক অতীতে সিঙ্গুর বা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত বিতর্ক প্রসঙ্গেও এ দিন কড়া অবস্থান নেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, সাম্প্রতিক অতীতকে কখনই ইতিহাস বলা চলে না। তাঁর মন্তব্য, “২০২৬-এ বিজেপি জিতে গেল, আর আমি শিক্ষামন্ত্রী হয়ে ইতিহাস বইয়ে লিখে দিলাম কী ভাবে জিতল, এটা ইতিহাস হতে পারে না। তা নিয়ে ম্যাগাজিনে প্রবন্ধ লেখা যেতে পারে, কিন্তু তা পাঠ্যসূচীতে স্থান পেতে পারে না।”
একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন যে রাজ্য সরকার ছাত্রছাত্রীদের মগজধোলাই বা ‘ব্রেন ওয়াশিং’-এ বিশ্বাসী নয়, বরং তাদের চিন্তন ক্ষমতা বৃদ্ধি বা ‘ব্রেন স্টর্মিং’-এর মাধ্যমে স্বাধীনভাবে ভাবতে শেখানোই বর্তমান শিক্ষা দপ্তরের প্রধান লক্ষ্য। সব মিলিয়ে, পরীক্ষার তারিখ বদল এবং নতুন পাঠ্যক্রম চালুর এই যুগান্তকারী ঘোষণায় রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক রাজনৈতিক ও শিক্ষাগত চর্চা।
Leave a comment