কলকাতা: কলকাতা পুলিশের সদর দফতর লালবাজারে এক আবেগঘন ও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে ৩০৯ জন নবনিযুক্ত সাব-ইনস্পেক্টরের (SI) হাতে নিয়োগপত্র তুলে দিলেন রাজ্য প্রশাসনিক প্রধান তথা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
লালবাজারের এই বিশেষ মঞ্চ থেকেই নতুন অফিসারদের উদ্দেশ্যে ‘নেশন ফার্স্ট’ (রাষ্ট্রই প্রথম) এবং ‘ইমানদারি’ (সততা)-র মূল মন্ত্র পাঠ করালেন মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে সমাজবিরোধী ও অপরাধীদের দমনে পুলিশ প্রশাসনকে দু’টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ‘খোলা হাত’ বা অবাধ স্বাধীনতা দেওয়ার কথা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন তিনি।
লালবাজার থেকে মুখ্যমন্ত্রী লাল অক্ষরে হুঁশিয়ারি ও আশ্বাসের সুরে জানান, রাজ্য জুড়ে নেশামুক্তি অভিযান এবং মহিলাদের ওপর যে কোনও ধরনের অন্যায়-অত্যাচার রোধের ক্ষেত্রে পুলিশকে বিন্দুমাত্র আপস না করে চরম কঠোর পদক্ষেপ করতে হবে।
এই দুই ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বা অপরাধ রুখতে গিয়ে যদি কোনও সমস্যা বা রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়, তবে মুখ্যমন্ত্রী নিজে সামনে দাঁড়িয়ে পুলিশের প্রধান ঢাল হয়ে উঠবেন। তবে একই সঙ্গে হুঁশিয়ারির সুর চড়িয়ে তিনি স্পষ্ট করে দেন, ‘‘ডিউটিতে থাকা পুলিশের গায়ে যদি কেউ হাত তোলার দুঃসাহস দেখায়, তবে তাকে সোজা জেলের ভাত খেতে হবে। আর আন্দোলনের নামে বা গোলমাল পাকিয়ে যদি কেউ সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করে, তবে তার কাছ থেকে কড়া আইনি প্রক্রিয়ায় তিনগুণ টাকা উসুল করা হবে।’’
এদিন লালবাজারের ঐতিহাসিক অডিটোরিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০৯ জন নবনিযুক্ত এসআই-এর হাতে নিয়োগপত্র হস্তান্তরের পর শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘‘পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে রাষ্ট্রকেই সবার আগে রাখতে হবে। কাজের ক্ষেত্রে সততা বা ইমানদারি বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।’’
পাশাপাশি নতুন অফিসারদের নিজেদের ঊর্ধ্বতন পুলিশ আধিকারিকদের নির্দেশ কঠোরভাবে মেনে চলার পরামর্শ দেন তিনি। ডিউটির ক্ষেত্রে সময়ের ঘড়ি না দেখে আত্মনিবেদনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দেন যে, নতুন বলবৎ হওয়া ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’ (BNS)-র প্রতিটি ধারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ চালাতে হবে।
রাজ্য পুলিশের সামগ্রিক ভূয়সী প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, ভৌগোলিক ও জনবিস্ফোরণের দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গে কাজ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তিনি বলেন, ‘‘প্রায় ১১ কোটি মানুষের বাস এই বাংলায়। এখানে ভাষার বৈচিত্র্য, পোশাক ও খাদ্যাভ্যাসের ভিন্নতা অপরিসীম। একদিকে উত্তরের দুর্গম পাহাড়, একদিকে জঙ্গলমহল, আবার অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের একাধিক বিচ্ছিন্ন ও সংবেদনশীল দ্বীপ। এই বিশাল বৈচিত্র্যের মধ্যে দিনরাত এক করে সাধারণ মানুষের জনজীবন স্বাভাবিক রাখার কঠিন দায়িত্ব পালন করে পুলিশ।’’
আরও পড়ূুন: কালীঘাটে ‘হামলা’! নাম না করে শুভেন্দুকে কটাক্ষ মমতার, তোপ পুলিশকে
তিনি আক্ষেপের সুরে স্বীকার করেন, দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ কর্মীরা আর্থিক সুরক্ষা ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। তবে বর্তমান রাজ্য সরকার তাদের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক নিরাপত্তা প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পুলিশের পরিকাঠামো আধুনিকীকরণ ও বৈপ্লবিক প্রশিক্ষণের জোরদার বন্দোবস্ত করা হচ্ছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। এই উদ্দেশ্যে অসমের অত্যন্ত সুখ্যাত পুলিশ ট্রেনিং ক্যাম্পের সঙ্গে রাজ্য সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি, অপরাধ দমন ও সুরক্ষার সুবিধার্থে কেন্দ্রীয় সরকারের নিরাপত্তা সংস্থাগুলির সঙ্গে রাজ্য পুলিশের আন্তঃসম্পর্ক ও সমন্বয় আরও বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাজ্যে পুলিশ বাহিনীতে দীর্ঘদিন ধরে চলা শূন্য পদের ঘাটতি নিয়েও খোলাখুলি কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, পুলিশের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজ্য কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও তা দ্রুত গতিতে মেটানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে রাজ্য পুলিশে প্রায় ১১ হাজার পদ পূরণ করা হয়েছে। তবে বর্তমানেও রাজ্য পুলিশ বিভাগে প্রায় ৪৬ হাজার পদ ফাঁকা পড়ে রয়েছে। সেই সমস্ত শূন্যপদ পর্যায়ক্রমে দ্রুত পূরণ করা হবে।
নিয়োগের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী লালবাজারের মঞ্চ থেকে বিরাট ঘোষণা করেন। তিনি জানান, খুব শীঘ্রই ৬,৩৪৫ জন মহিলা পুলিশ কর্মী নিয়োগ করা হবে। এছাড়া কলকাতা পুলিশেই পৃথকভাবে ৪ হাজার কনস্টেবল পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু হবে।
আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পুলিশ বিভাগে ঢালাও নিয়োগ হতে চলেছে। বিশেষ করে ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি মাসের মধ্যেই ফের পুলিশে নতুন নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে। শুধু স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ দপ্তরই নয়, এর পাশাপাশি বন দপ্তর এবং দমকল বিভাগেও বড় মাপের নতুন নিয়োগের আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
Leave a comment